গুলশান হামলার পরিকল্পনাকারী হিসেবে যাদের চিহ্নিত করেছিল পুলিশ, তাদের একজন ‘রাজীব গান্ধী’ জীবিত অবস্থায় ধরা পড়েছেন।
শুক্রবার রাতে গ্রেপ্তার নব্য জেএমবির শীর্ষস্থানীয় এই নেতার কাছ থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঝড় তোলা ওই হামলার ভেতরকার তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন গোয়েন্দারা।
গুলশান হামলার পরিকল্পনাকারী হিসেবে পুলিশের চিহ্নিত তামিম চৌধুরী, জাহিদুল ইসলা, নুরুল ইসলাম মারজান, তানভীর কাদেরী বিভিন্ন স্থানে পুলিশের অভিযানের সময় নিহত হয়েছেন।
‘রাজীব গান্ধী’কে শুক্রবার রাতে টাঙ্গাইল থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা।
পুলিশের ভাষায়, উত্তরাঞ্চলে সব কটি জঙ্গি হামলায় নেতৃত্ব দাতা এই ‘রাজীব গান্ধী’। তার আসল নাম জাহাঙ্গীর আলম। ‘রাজীব গান্ধী’ ছাড়াও সুভাস, শান্ত, টাইগার, আদিল, জাহিদ এই রকম নানা ছদ্ম নাম নিয়ে চলতেন তিনি।
রাজীব গান্ধী ওরফে জাহাঙ্গীরকে টাঙ্গাইল থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকায় আনার পর শনিবার ডিএমপি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসেন কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, “নিও জেএমবির শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী জাহাঙ্গীর সংগঠনটির উত্তরবঙ্গের সামরিক শাখার কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
“তামিম চৌধুরী ও নুরুল ইসলাম মারজানের সঙ্গে গুলশান হামলার পরিকল্পনায় তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন বলেও প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে।”
গুলশান হামলার ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় বিকালে জাহাঙ্গীর ওরফে ‘রাজীব গান্ধী’কে ঢাকার আদালতে তুলে ১০ দিনের রিমান্ডে চান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কাউন্টার টেরররিজম ইউনিটের পরিদর্শক হুমায়ুন কবির।
শুনানি শেষে হাকিম মাহমুদুল হাসান আট দিন হেফাজতের নির্দেশ দেন। আসামির পক্ষে কোনো আইনজীবী আদালতে দাঁড়াননি।
জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য গুলশান হামলাসহ অন্যান্য হামলার ঘটনা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন মনিরুল।
পুলিশের সাম্প্রতিক অভিযানে তামিম চৌধুরী, জাহিদুল ইসলাম, তানভীর কাদেরি মারা যাওয়ার পর রাজীব গান্ধীর পাশাপাশি বাসারুজ্জামান চকলেটসহ অন্য একজনকে ধরতে অভিযান চলছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা বলে আসছিলেন।
মনিরুল বলেন, গুলশান হামলায় জড়িত আরও তিন ‘মাস্টারমাইন্ডের’ তথ্য তারা পেয়েছেন।
“তাদের একজন বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট। তদন্তের স্বার্থে বাকিদের নাম বলা যাচ্ছে না।”
জাহাঙ্গীরের বাড়ি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে বলে পুলিশ জানায়। তার বাবার নাম ওসমান গনি মন্ডল ও মা রাহেলা মন্ডল।
মনিরুল বলেন, জাহাঙ্গীর ২০০৪ সালে পুরনো জেএমবির শূরা সদস্য ডা. নজরুল ইসলামের সহযোগী ছিলেন। ১৭ অগাস্ট সারাদেশে বোমা হামলার সময় বগুড়ার সংগঠনটির দায়িত্বে ছিলেন আবদুল আউয়াল। জাহাঙ্গীর তার পাচক হিসেবে কাজ করতেন।
গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি; যেখানে জঙ্গি হামলায় মারা যান ১৭ বিদেশি গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি; যেখানে জঙ্গি হামলায় মারা যান ১৭ বিদেশি
গুলশানে হামলার সময় জাহাঙ্গীর স্ত্রীসহ বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ছিলেন বলে মনিরুল জানান।
“বসুন্ধরার বাসাটিতে এক সপ্তাহ অবস্থান করে পাঁচ সন্ত্রাসীকে হামলায় অংশ নেওয়ার জন্য চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত করেছিলেন তিনি। পরে তিনি মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় চলে যান।”
গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালিয়ে বিদেশিদের হত্যা করতে মো.খায়রুল ইসলাম পায়েল ওরফে বাঁধন এবং মো. শফিকুল ইসলাম উজ্জল ওরফে বিকাশকে নির্বাচিত করে জাহাঙ্গীর ওরফে রাজীব গান্ধীই ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন বলে জানান গোয়েন্দা কর্মকর্তা মনিরুল।
তিনি বলেন, গুলশান হামলার পর পুলিশের মনে ভয় তৈরি করতে হামলা চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় তার একটা ছবি পাওয়ার পর এবং তার নাম প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় ঢাকা ছেড়েছিলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, রংপুরে জাপানের নাগরিক কুনিও হোশি হত্যা, টাঙ্গাইলের দর্জি নিখিল হত্যা, পাবনার পুরোহিত নিত্যরঞ্জন পান্ডে হত্যা, রংপুরের মাজারের খাদেম রহমত আলী হত্যা, কুষ্টিয়ায় হোমিও চিকিৎসক সানাউর হত্যা, পঞ্চগড়ে পুরোহিত যজ্ঞেশ্বর হত্যা, দিনাজপুরের হোমিও চিকিৎসক ধীরেন্দ্রনাথ হত্যা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীর হত্যাসহ ২২টি হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি জাহাঙ্গীর ওরফে রাজীব গান্ধী।
কুড়িগ্রামে ধর্মান্তরিত মুক্তিযোদ্ধা হোসেন আলী হত্যামামলায় তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
