কয়েক বছর আগের ঘটনা। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি সাজাপ্রাপ্ত রাজধানীর এক শীর্ষ সন্ত্রাসীকে প্রিজন ভ্যানযোগে আদালতে মামলার হাজিরা দিতে পাঠানো হয়। প্রিজন ভ্যানে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের টাকা-পয়সা দিয়ে ম্যানেজ করে ওই শীর্ষ সন্ত্রাসী আদালতে হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে তার বাসায় স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে চার ঘণ্টা সময় কাটান। পরবর্তীতে তার স্ত্রী সন্তানও প্রসব করে। এ ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে কারা অধিদফতরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়।
এটি কোনো গল্প কিংবা নাটকের দৃশ্যায়ন নয়, বাস্তব ঘটনা। কারা অধিদফতরের শীর্ষ এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বুধবার জাগো নিউজের এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানিয়ে বলেন, কারাগার থেকে আসামিকে আদালতে নেয়ার দায়িত্ব পালন করে পুলিশ। সুতরাং পরিবহনকালে এ ধরনের ঘটনা গোটা প্রশাসনকে তীব্র সমালোচনার মুখে ফেলে দেয় বলে মন্তব্য করেন ওই কর্মকর্তা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে- এ ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে কারাগারের দুর্ধর্ষ অপরাধী বন্দিদের এক জেলখানা থেকে অন্য জেলখানায় স্থানান্তরের জন্য দুটি উন্নত প্রযুক্তির ওয়েভ বেইজড বাংলাদেশ জেল প্রিজন ভ্যান চালু করতে যাচ্ছে কারা অধিদফতর। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অধীনে পরিচালিত গাজীপুরের বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি থেকে সম্প্রতি কারা অধিদফতর এ দুটি প্রিজন ভ্যান প্রায় দুই কোটি টাকা দিয়ে কিনেছে।
কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আগামী ১৯ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বিশেষায়িত এ দুটি ভ্যানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। কারা অধিদফতরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (প্রশাসন) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, কেরানীগঞ্জে উদ্বোধন করলেও ভ্যান দুটি কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারের বন্দিদের আনা-নেয়ার কাজে ব্যবহৃত হবে।
জানা গেছে- আধুনিক প্রযুক্তি সম্বলিত প্রিজন ভ্যান দুটিতে বিশেষায়িত সফটওয়্যারের মাধ্যমে ভ্যানে অবস্থানকারী দুর্ধর্ষ আসামি ও কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি মুহূর্তের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ সফটওয়্যারের সঙ্গে যুক্ত কারা অধিদফতরের কর্মকর্তারা বাংলাদেশসহ বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে গাড়ির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। মোবাইল ফোনের মাধ্যমেও গতিবিধি জানা যাবে। গ্রামীণফোন বিশেষায়িত এ সফটওয়্যার তৈরি করেছে বলে একটি সূত্র জানায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কারা অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা জানান, কাশিমপুর হাই-সিকিউরিটি কারাগারে জেএমবি, হরকাতুল জেহাদ, জঙ্গি ও শীর্ষ সন্ত্রাসীরা বন্দি রয়েছেন। তাদের জন্য কারা অভ্যন্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট জোরদার থাকলেও যখন তাদের এক জেলখানা থেকে আরেক জেলখানায় স্থানান্তর করা হয় তখন পথিমধ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতোদিন জোরদার ছিল না। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা থেকে দুর্ধর্ষ এসব আসামিদের পথিমধ্য থেকে ছিনিয়ে নেয়ার নানা পরিকল্পনা থাকার কথা অনেক সময় জানলেও এতোদিন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ করা সম্ভব ছিল না।
২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কারাগার থেকে ময়মনসিংহের একটি আদালতের মামলায় হাজিরা দিতে যাওয়ার সময় তিন জঙ্গি (মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি সালাউদ্দিন সালেহীন ওরফে সানি, রাকিবুল হাসান ওরফে হাফেজ মাহমুদ ও যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত জাহেদুল ইসলাম ওরফে বোমারু মিজান) প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যান।
উন্নত প্রযুক্তির প্রিজন ভ্যান অচিরেই চালু সম্পর্কে জানতে চাইলে কারা অধিদফতরের এআইজি প্রিজন (প্রশাসন) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, কাশিমপুর হাই-সিকিউরিটি জেলে দুর্ধর্ষ কারাবন্দিদের এক জেলখানা থেকে আরেক জেলখানায় কিংবা আদালতে হাজিরা দিতে নেয়ার সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দুটি হাইটেক প্রিজন ভ্যান চালু হচ্ছে। ১৯ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রিজন ভ্যান দুটি চালু করবেন বলে তিনি জানান।
