ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের জন্য সব প্রস্তুতি নেওয়ার পর শেষ সময়ে এসে ৩৬টি ওয়ার্ড নিয়ে বিপাকে পড়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এসব ওয়ার্ডের সব কাউন্সিলররা এক সঙ্গে ভোট না করতে কমিশনের কাছে সময় চেয়ে আবেদন করেছেন। ফলে কমিশন অস্বস্তিতে পড়েছে। নির্বাচন কর্মকর্তারা জানান, দুই সিটির সম্প্রসারিত ১৮টি করে মোট ৩৬টি ওয়ার্ডের সংরক্ষিতসহ মোট ৪৮ জন কাউন্সিলর সময় চেয়ে কমিশনের কছে আবেদন করেছেন। তাদের দাবি নির্বাচিত হওয়ার পর নিজ এলাকার উন্নয়নের জন্য এক বছরও সময় পাননি। অথচ একজন কাউন্সিলর ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হন। সেক্ষেত্রে দুই সিটির এসব সম্প্রসারিত ওয়ার্ডে এখন ভোট না দিয়ে তাদেরকে পর্যাপ্ত সময় কাজ করার সুযোগ করে দিতে।
নির্বাচন পরিচালনা শাখা জানায়, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটির উপ-নির্বাচনের সঙ্গে প্রথম বারের মত সম্প্রসারিত ৩৬ ওয়ার্ডে ভোট করে ইসি। এখন চলতি মাসের শেষে অথবা ডিসেম্বরের শুরুতে তফসিল দিয়ে জানুয়ারির মাঝামাঝি আথবা শেষে মেয়র পদের সঙ্গে সব ওয়ার্ডে ভোট করার প্রস্তুতি নিয়েছে ইসি। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার রফিকুর ইসলাম বলেন, কোনটাতে ভোট করা যাবে কোনটাতে যাবে না এটা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিষয়। তারা বললে কমিশন তফসিল দিয়ে নির্বাচন পরিচালনা করে।
সম্প্রসারিত ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের আবেদনের প্রেক্ষিতে নির্বাচন করতে কোন আইনি জটিলতা আছে কিনা এমন প্রশ্নে-তিনি বলেন, এ বিষয়টি নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞ সঙ্গে আলাপ না করে বলতে পারব না। তবে একটা সহজ বিষয় এটা একটি পরিষদ। পরিষদ ভেঙ্গে দিলে পুরোটা দিতে হয়। নতুন সম্প্রসারিত ওয়ার্ড গুলো সিটি কর্পোরেশনের অংশ। মেয়র নির্বাচনে এ ওর্য়াড গুলো ছাড়া নির্বাচন কিভাবে হবে।পুরোটা একটি পরিষদ। সেক্ষেত্রে এক সঙ্গে নির্বাচন করতে হবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৫৮ নম্বার ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা নির্বাচিত হওয়ার পর একবছর সময় পাইনি এলাকার কাজ করার জন্য। এ কারণে কমিশনের কাছে আবেদন করেছি আমাদের যেন কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়। কমিশন ছাড়া অন্য কোথাও আবেদন করেছেন কিনা এমন প্রশ্নে- তিনি বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত শুধু কমিশনের কাছে আবেদন করেছি। এসব ওয়ার্ডে দেরিতে ভোট করলে কাজ করার সময় পাওয়া যেত। কমিশনের উপর আস্থা রেখে আমরা অন্য কোথাও যায়নি।
সূত্র জানায়, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের জন্য সব ধরণের প্রস্তুতি নিয়েছে ইসি। নভেম্বরের শেষে তফসিল দিয়ে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি ভোট করতে চায় ইসি। বিকল্প হিসেবে ডিসেম্বরের শুরুতে তফসিল দিয়ে জানুযারির শেষে ভোট করারও সময় ধরে রেখেছে ইসি। গতবার তিন সিটি নির্বাচন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলেও এবার চট্টগ্রাম সিটি মার্চে অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েচে ইসি কর্মকর্তরা। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ভোট করার জন্য ইসিকে গ্রীণ সিগন্যাল দিয়ে চিঠি দিয়েছে। আইন অনুযায়ী ইসি ভোট করতে পারবে এতে কোন বাধা থাকবে না বলে জানিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। গত ১৭ নভেম্বর ঢাকা উত্তর সিটির দিন গণনা শুরু হয়েছে। বুধবার (২০ নভেম্বর) ঢাকা দক্ষিণ সিটির দিন গণনা শুরু হবে।
ইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল এক দিনে ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটিতে ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করর্পোরেশন ভোটের বিষয়ে একটি পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রথমত, জানুয়ারিতে ঢাকার দুই সিটিতে ভোট দিয়ে মার্চে চট্টগ্রামে ভোট সম্পন্নের পরিকল্পনা নিয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রথম বৈঠক হয়েছিল ২০১৫ সালের ১৪ মে ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করর্পোরেশনের বৈঠক ১৭ মে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
অপরদিকে, এর প্রায় তিন মাস পর ৬ আগস্ট অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রথম বৈঠক। সেই হিসেবে এ গত ১৭ নভেম্বর ঢাকা উত্তর সিটির দিন গণনা শুরু হয়েছে। বুধবার (২০ নভেম্বর) ঢাকা দক্ষিণ এবং আগামী বছর ৯ ফেব্রয়ারি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দিন গণনা শুরু হবে। সিটি করর্পোরেশন আইন অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান রয়েছে। আর আইন অনুযায়ী করপোরেশনের প্রথম বৈঠক থেকে এর মেয়াদ গণনা শুরু হয়।
ইভিএমের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত: চলতি বছরের গত ৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত কমিশনের ৪৭তম বৈঠকে ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করর্পোরেশনে শতভাগ ইভিএম ব্যবহার করে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। এদিকে প্রাথমিকভাবে ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটির ভোটের জন্য প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকার বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে। কমিশনে এই বাজেট উপস্থাপন করা হবে। তবে এ তিন সিটি নির্বাচনের সম্পূর্ণ ভোটই যেহেতু ইভিএমে হবে, তাই এই বাজেট বাড়বে।
জানা যায়, ২০১৭ সালে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (নিকার) গত ৯ মে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে নতুন করে মোট ১৬টি ইউনিয়ন যুক্ত করার প্রস্তাব অনুমোদন করে, যার মধ্য দিয়ে ঢাকার দুই সিটির আয়তন বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়। ২০১৭ সালের ২৮ জুন ঢাকা সিটির আয়তন বাড়িয়ে গেজেট প্রকাশ করে সরকার। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে যুক্ত বাড্ডা, ভাটারা, সাতারকুল, বেরাঈদ, ডুমনি, উত্তরখান, দক্ষিণখান ও হরিরামপুর ইউনিয়নকে ৩৭ থেকে ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডে বিভক্ত করা হয় সে সময়।
আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে যুক্ত শ্যামপুর, দনিয়া, মাতুয়াইল, সারুলিয়া, ডেমরা, মান্ডা, দক্ষিণগাঁও ও নাসিরাবাদ ইউনিয়নকে ৫৮ থেকে ৭৫ নম্বর ওয়ার্ডে বিভক্ত করেছে সরকার। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সম্প্রসারিত ৩৮, ৩৯ ও ৪০ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে সংরক্ষিত আসনের ১৩ নম্বর ওয়ার্ড; ৩৭, ৪১ ও ৪২ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে ১৪ নম্বর; ৪৩, ৪৪ ও ৪৫ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে ১৫ নম্বর; ৪৬, ৪৭ ও ৪৮ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে ১৬ নম্বর; ৪৯, ৫০ ও ৫১ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে ১৭ নম্বর এবং ৫২, ৫৩ ও ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে সংরক্ষিত আসনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ড গঠন করা হয়েছে।
আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সম্প্রসারিত ৭৩, ৭৪ ও ৭৫ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে সংরক্ষিত আসনের ২০ নম্বর ওয়ার্ড; ৭০, ৭১ ও ৭২ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে ২১ নম্বর; ৬৭, ৬৮ ও ৬৯ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে ২২ নম্বর; ৬৪, ৬৫ ও ৬৬ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে ২৩ নম্বর; ৬১, ৬২ ও ৬৩ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে ২৪ নম্বর এবং ৫৮, ৫৯ ও ৬০ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে সংরক্ষিত আসনের ২৫ নম্বর ওয়ার্ড গঠন করা হয়েছে। নতুন করে ১৬টি ইউনিয়ন যুক্ত হওয়ায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার আয়তন ১২৯ বর্গকিলোমিটার থেকে বেড়ে ২৭০ বর্গকিলোমিটার হয়েছিল।
