এ দুই বাহিনীর শতশত কোটি টাকার সরঞ্জাম নষ্ট হয়।
তদন্তের পর তৎকালীন বিমান এবং নৌবাহিনীর প্রধানসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেন তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাব উদ্দিন আহমদ।
এ ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় এক লাখ চল্লিশ হাজার মানুষের মৃত্যু বিশ্বাসীকে চমকে দিয়েছিল।
নিহতদের অনেক আত্নীয়-স্বজন বলছেন, তারা ঠিকমতো সতর্ক বার্তা শোনেননি।
আবার অনেকে বলছেন,সতর্ক বার্তা শুনলেও তারা সেটিকে যথেষ্ঠ গুরুত্ব দেননি।
“বিভিন্ন সংস্থার লোকজন মাইকিং করতেছিল। বলছিল যে মহাবিপদ সংকেত। উপকূলের মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে আসার জন্য বারবার বলতেছিল। কিন্তু কোন মানুষ সেটাকে পাত্তা দেয় নাই। অনেকে বলছে ১০ নম্বর সিগনালে কিছু হবে না,” বলছিলেন সন্দীপের তৎকালীন বাসিন্দা মিসেস শিউলি।
এতো বছর পরে এসেও সে ঘুর্নিঝড়ের স্মৃতি সেখানকার মানুষ ভুলতে পারছেন না।
একরাতেই লক্ষ-লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। বেঁচে থাকা অনেকের কাছেই ছিল অলৌকিক ঘটনার মতো।
তৎকালীন বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা মি: হুদা বলছিলেন, সে রাতের কথা তিনি এখনো ভুলতে পারছেন না।
“সেটা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। কর্ণফুলী নদী আর এয়ারপোর্ট সব একসাথে পানিতে মিশে গেল। দেখে মনে হলো সবটাই সাগর। মনে হলো আমরা আল্লাহর রহমতে বেঁচে গেলাম।”
ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতা ছিল এক রকম এবং পরবর্তী বিভীষিকা ছিল অন্যরকম।
ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত বিস্তীর্ণ উপকুল জুড়ে ছিল খাবার ও পানির সংকট। বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাবে ছড়িয়ে পড়ে নানা ধরনের রোগ।
ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে শুরু হয় বেঁচে থাকার সংগ্রাম ও টিকে থাকার লড়াই।
মিসেস শিউলি বলছিলেন, ” কোন বিশুদ্ধ পানি ছিল না। বন্যার পরে ডায়রিয়ায় অনেকে মারা গেল। মানুষ যে আবার বেঁচে উঠবে এবং সংসার করতে পারবে, এ ধরনের ধরনা কারো মধ্যে ছিল না।”
জান্নাতুল নাইম শিউলির দাদী ঘূর্ণিঝড়ের পরে মারা গেলেন। মৃত্যুর আগে তার দাদী এক গ্লাস পানি খেতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু দাদীকে কোন পানি খাওয়াতে পারেন নি তারা। কারণ চারদিকে তখন বিশুদ্ধ খাওয়ার পানির তীব্র সংকট।
“আমার দাদীর খুব ডায়রিয়া হলো। বারবার পানি খোঁজ করতেছে। কিন্তু পানি নাই। কোথা থেকে পানি দিব? উনি একটু টাটকা পানি খেতে চাইছিলো। আমাকে বললো, একটু পানি দে। আমি বললাম এ পানিটা খান। বললো, না, আমি খাবো না। ঐদিক ফেরে গেল..দাদী মারা গেল,” বলছিলেন মিসেস শিউলি।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সহায়তার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এগিয়ে আসে।
উপকূলের মানুষকে মানবিক সহায়তার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর ‘অপারেশন সি এঞ্জেল’ শুরু হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে দীর্ঘ সময় নির্ভরশীল থাকতে হয় ত্রাণ সহায়তার উপর।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা এতো বেশি ছিল যে ত্রাণ সহায়তা পর্যাপ্ত ছিল না।
মিসেস শিউলির বর্ণনা ছিল এ রকম, “অনেক মানুষ। কাকে বাদ দিয়ে কাকে দেবে? অনেক লম্বা লাইন। বহু পরিবার ছিল যাদের সদস্য সংখ্যা অনেক। দেখা গেছে, কয়েক বেলা পরে খাবার নাই। তখন আবার বসে থাকতো খাবারের আশায়। সাহায্যের আশায় সবাই বসে রইলো”
স্বাধীন বাংলাদেশে এর আগে প্রাকৃতিক দুর্যোগে একসাথে এতো মানুষ কখনো মারা যায়নি।
১৯৭০ সালে উপকূলীয় জেলায় শক্তিশালী এক ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল বলে বলা হয়।
১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতি কাটিয়ে পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে কয়েক বছর সময় লেগেছিল চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূলের মানুষের।
সে ঘূর্ণিঝড়ের পর বাংলাদেশের উপকূলে প্রচুর ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়।
একই সাথে ঘূর্ণিঝড়ের সময় উপকূলের মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়স্থলে সরিয়ে আনার পদ্ধতিও বেশ জোরদার হয়েছে।
আগের তুলনায় ঝড়ের সতর্ক সংকেত উপকূলের মানুষের কাছে আরো কার্যকরী ভাবে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সে ঝড়ের পর বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগে একসাথে এতো মানুষ আর মারা যায়নি।
যারা সে ঝড়ের প্রত্যক্ষদর্শী তাদের মন থেকে সে রাতের দু:সহ স্মৃতি হয়তো কখনোই মুছে যাবে না।
সে কারণে ১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিল এখনো বাংলাদেশের বহু মানুষের কাছে ‘ভয়াল রাত’ হিসেবে পরিচিত।বিবিসি