২৩শে অক্টোবর, ২০২১ ইং | ৭ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | শনিবার | ভোর ৫:০৩

দখল-দূষণে মৃত্যুপথযাত্রী তুরাগ

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

দখল-দূষণে ক্রমেই মারা পড়ছে তুরাগ। সিমেন্টের পিলার ও বাঁশের খুঁটি স্থাপন করেও রক্ষা করা যায়নি নদকে। প্রকাশ্যে চলছে এসব দখলযজ্ঞ। বার বার অবৈধ দখলের কারণে নদের চরিত্র হারিয়ে গেছে। অবৈধ দখলে পাল্টে গেছে নদের প্রকৃত মানচিত্র।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সদস্য সচিব মিহির কান্তি বিশ্বাসের বরাত দিয়ে দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, দখল ও দূষণের কারণে তুরাগ এখন মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। নদে এখন মাছের অস্তিত্ব নেই। জেলেরা মাছ নেই বলে জালও ফেলে না। এ ছাড়া অর্ধ শতাধিক অবৈধ দখলদার গিলে খাচ্ছে পুরো নদটি। তুরাগের দুই পাশ সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে অবৈধ দখলের নানা চিত্র।

পত্রিকাটি জানায়, দুই বছরে ছয়বার অবৈধ দখল উচ্ছেদ করেও দখলদারমুক্ত করা যায়নি। দখলের কবলে পড়ে ক্রমেই শীর্ণকায় হচ্ছে তুরাগ। ফলে কয়েকটি স্থানে স্বাভাবিক নাব্যতা হারিয়ে বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয়েছে বিপজ্জনক বাঁক। ঝুঁকির মুখে ঢাকা শহর রক্ষা বাঁধ ও মিরপুর ব্রিজ। নাব্যতা সংকটের কারণে আশুলিয়া থেকে সদরঘাট পর্যন্ত সাড়ে ২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ অর্ধ-বৃত্তাকার নৌরুটটি বন্ধের পথে। মিরপুর ব্রিজের পিলারে বালুবাহী নৌযানগুলো নোঙর করার সময় আঘাত হানে। ফলে কয়েকটি স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি সিনি্নরটেক এলাকায় অবৈধভাবে ১০-১২টি ইট, বালু ও সুরকি বিক্রির টংঘর নির্মাণ করে প্রতি মাসে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে কয়েক লাখ টাকা। তবে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় তুরাগের ৪২ জন অবৈধ দখলদারের তালিকা তৈরি করেছে। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দখলের কারণে থামছে না তুরাগের কান্না। ক্রমেই শীর্ণকায় হচ্ছে। বাঁধের কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বাঁধ কেটে ঘর, দোকান, হোটেল ও রিকশার গ্যারেজ নির্মাণ করা হয়েছে। এসব স্থানে বাঁধ কেটে ফেলায় কিছু অংশ অরক্ষিত ও হুমকির মুখে। বর্ষা মৌসুমে বড় ধরনের বৃষ্টিপাত হলে যে কোনো অঘটন ঘটে যেতে পারে বলে স্থানীয় এলাকাবাসী মনে করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সিনিয়র আইনজীবী ড. তুহিন মালিক বলেন, নদের অবৈধ দখলের দেখভালের দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। পাশাপাশি হাজারীবাগের কলকারখানা দ্রুত সরিয়ে নেওয়া না হলে তুরাগের দূষণ কমবে না। ঢাকা বাঁচাতে হলে বুড়িগঙ্গার মতো তুরাগকে বাঁচাতে হবে। নতুবা ঢাকার মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে তুরাগ। তখন নদীর বুক চিরে নৌকার বদলে প্রাইভেট কার চলবে। পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) মো. আলমগীর বলেন, ১০ মে পর্যন্ত তুরাগ নদ দূষণ ও অবৈধ দখলের কারণে ২২ প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। কয়েকটি স্থানে উচ্ছেদের জন্য জেলা প্রশাসনকে চিঠি দিয়ে অবহিত করা হয়েছে।

সরেজমিন প্রতিবেদন উপস্থাপন করে পত্রিকাটি জানায়, শহর রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন স্থানে ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে স্থানীয় চার ব্যক্তি নদের তীর দখল করে রিকশার গ্যারেজ, ঘরবাড়ি ও ভাতের হোটেল নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছে। আদাবরে ঢাকা উদ্যানের আশপাশের এলাকায় দেখা গেছে নদের তীরে শতাধিক দোকান ও কাঁচাবাজার গড়ে তোলা হয়েছে। এ ছাড়া হাজারীবাগের সেকশন ব্রিজের পাশে দেখা গেছে ইট, বালু, লাকড়ি, সুরকি, পাথর ও সিমেন্ট বিক্রির জমজমাট ব্যবসা কেন্দ্র। এভাবে প্রতি মাসে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। মিরপুর ব্রিজের আশপাশের এলাকায় কোথাও ফাঁকা জায়গা নেই। দখলের কারণে ঝুঁকির মুখে মিরপুর ব্রিজ। অনবরত বালু উত্তোলনের কারণে ব্রিজের পিলারের কাছ থেকে মাটি সরে গেছে। অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় যে কোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের ১২ জেলার সড়ক যোগাযোগ। চিড়িয়াখানার পেছনের অংশ গড়ান চটবাড়ি এলাকায় দেখা গেছে তীর দখল করে ১০ থেকে ১২টি বিনোদন কেন্দ্র কাম টংঘর বানানো হয়েছে। এসব টংঘরে ফাস্টফুড বিক্রির নামে মাদক বেচাবিক্রি ও অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ রয়েছে। এসব স্থানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শত শত যুবক-যুবতী মাদকের আসরে নিমজ্জিত হয়। স্থানীয় এলাকাবাসীর অভিযোগ, থানা পুলিশকে ম্যানেজ করে চলছে এসব কার্যকলাপ। এ ছাড়া আশুলিয়া ব্রিজের আশপাশের নদের তীরের মাটি কেটে নেওয়ায় সেখানেও ঝুঁকির মুখে ব্রিজটি। এ ব্রিজের চারপাশে এক ডজন ব্যবসায়ী তীর দখল করে বালুর ব্যবসা করছে।

Share.

Comments are closed.