২৩শে অক্টোবর, ২০২১ ইং | ৭ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | শনিবার | ভোর ৫:০২

আঙুলে লেখা প্রেম

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

বিমানবন্দর রেলস্টেশন। যাত্রীছাউনিতে অপেক্ষমাণ যাত্রীরা। গন্তব্য দিগি¦দিক। ট্রেনের অপেক্ষায় আমিও। বসে আছি এক কনফেকশনারি দোকানের সামনে। কী একটা ম্যাগাজিনে চোখ বুলাচ্ছিলাম। গাড়ি আসতে আরো মিনিট দশেক দেরি হবে। তখন সূর্য মধ্য আকাশে। মধ্যাহ্নভোজের সময়।

বিমানবন্দরের গগনে মেঘ। কিছুটা ফিকে অন্ধকার। গোমরা মুখ। কেঁদে ওঠার আসন্ন মুহূর্ত। শুরু হয়েছে ঝমঝম বৃষ্টি। জলে ভেজা দুপুর। ধারাবাহিকভাবে আসমান প্রসব করছে সফেদ জল। লোহার পাতে পাথরে রেলওয়ের ছাদে বৃষ্টি পড়ছে আছড়ে। ছন্দ-তালে নাচছে বৃষ্টিকন্যারা।

ভেজা বাতাস বইছে। শরীর রোমাঞ্চিত হচ্ছে বাতাসের আর্দ্রতায়। নাকে লাগছে বৃষ্টির গন্ধ। আমার প্রিয় গন্ধ। ভালো লাগার শিহরণ।

ট্রেন চলে এসেছে বিমানবন্দরে। আরম্ভ হয়েছে যাত্রীদের ওঠানামার ব্যস্ততা। কলিদের হাঁকডাক। লোকজনের ধাক্কাধাক্কির ভিড়ে আমিও উঠে পড়লাম বগিতে। বসলাম কেনা আসনে। বাতায়ন পাশে। যাবো ভৈরবে। তারপর বাড়ি। ভৈরব আমার সামনে আর ঢাকা পেছনে। জানালা দিয়ে ঢাকার কিছু দেখতে হলে আমাকে মাথা ঘুরিয়ে উল্টো দিকে তাকাতে হয়। সুবিধামতো সামনে দৃষ্টি।

যানবাহনে সাধারণত বই পড়ি অথবা প্রকৃতির অপরূপ খেলা দেখি। ট্রেন আমাদের নিয়ে বিমানবন্দর ছেড়েছে।

আজ চিরসঙ্গী বইকে অবসর দিয়ে কেন জানি প্রকৃতি দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি। প্রকৃতি আমায় আকর্ষণ করছে। তার একান্ত কাছে টানছে। টঙ্গীর পর কোনো বৃষ্টি নেই। বৃষ্টির গন্ধও নেই। আমি অপলক তাকিয়ে আছি সম্মুখে। চেয়ে থাকতে ভালো লাগছে। এক ধরনের রোমান্টিকতা আসছে। অকস্মাৎ সামনের জানালা থেকে একটা সুন্দর মুখ বেরিয়ে এলো। মুহূর্তে চলে গেল। অবয়বটি বসেছে ঢাকার দিকে মুখ করে। তার প্রচ্ছন্ন চেহারা আমার নজর কাড়ল। আমি অবিরল ধারায় ঔৎসুকি নয়নে তাকিয়ে আছি সামনের দিকে। সুন্দর মুখখানা আবার জানালার চার পাশ আলোকিত করে ঢু মারল। আমি নিষ্পলক তাকিয়ে রই। বাতাসে আউলা করছে তার কেশ। পরিপাটি চুলগুলো বাতাসের স্পর্শে চোখে-নাকে এসে পড়ছে। সে নিজেই আপন হাতে নিপুণভাবে সরাচ্ছে। আমার ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে, আহ আমি যদি তার কেশগুলো ছুঁয়ে দিতে পারতাম। আহা কী সুন্দর রমণী। ডাগর ডাগর চোখ। মনে হয়, একেই বলে হরিণীর মতো চোখ।

অদৃশ্য এক ছায়া বলে এমন অধর বাতাসে দোলে। চোখে চোখ পড়েছে। প্রথম সে লজ্জায় অপ্রস্তুত। ইতস্তত বোধ করছে। আমি লজ্জহীনার মতো মিসরীয় নারীকে দেখছি। সেও বাঁকা চোখে। আহা কী মায়াবী চাহনি। বাতাস কণ্ঠ ধরেছেÑ ‘চোখে চোখে চোখ পড়েছে, কী বলব মুখে’। চোখের পাপড়িরা কথা বলছে। অধর হাসছে। দু’জনের হাত ভাসছে শূন্যে। আজ এই শুভক্ষণে চোখের কথা আমরা স্পষ্ট বুঝছি। লেনদেন করছি ভিন্ন কিছুর। স্বপ্ন ভালোবাসার কিংবা আরো গভীরের কিছু। গাড়ি তখন ঘোড়াশাল ছেড়ে চলছে। সে আর বাতায়নে নেই। বাতায়নটি যেন অন্ধকারে ছেয়ে আছে। কিছুক্ষণ আগের আলোড়ন নেই। ভেতরটা হাপিত্যেশ করছে। সে কি চলে গেল? আমাকে কিছুই বলল না। আমি ভাঙা মনে সামনের আসনে তাকালাম। আমার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি। সে আছে। এক ভদ্রমহিলার সাথে বাতচিত করছে। সম্ভবত তার মা। আমি বেশ জোরে অনর্থক গলা খিঁচুনি দিলাম। সেসহ অনেকে আমার দিকে তাকাল। আমার মনটা শান্ত হলো। বসে পড়লাম আসনে। আনমনা দৃষ্টিতে সবুজে তাকিয়ে আছি। মন আইটাই করছে। ব্যথিত অন্তরে আবৃত্তি করছি কবি জীবনানন্দ দাশের ‘হায় চিল সোনালী ডানার চিল এই ভিজে মেঘের দুপুরে… ’। আমার সুর বাতাসে ভাসছে। তার কান অবধি হয়তো পৌঁছবে না। জীবনানন্দ শেষ করার আগেই জানালাতে সেই বালিকার আগমন। আমার চোখ তখন ছলছল। তার চোখ দু’টি আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছে, তা দৃশ্যমান। আমি তাকে হাতের ইশারায় মোবাইল ব্যবহার করে কি না জিজ্ঞেস করলাম। মোবাইল আছে, তবে মায়ের হাতে থাকে। সে ইঙ্গিতে বুঝাল। নম্বর নেয়ার কোনো উপায় পাচ্ছি না। কলম কাগজেও লিখে দিতে পারছে না। না উচ্চারণ করতে পারছে। উপায় খুঁজছে চারটি চোখ। যুগল মস্তিষ্ক। হঠাৎ সে হেসে উঠল। প্রাপ্তির হাসি। সফলতার ব্যঞ্জনা। সে আমার কৌতূহলী দৃষ্টিকে আকর্ষণ করে ট্রেনের দেয়ালে শুভ্র আঙুল দ্বারা লিখতে লাগল ০১৭…। আমি মহানন্দে ঝটপট নম্বর লেখে নিলাম। ভেতরে অনুরণন হচ্ছে খুশির। সে হাত ইশারায় বুঝাল নেক্সট ফোন করবে। এই প্রেমকাব্যের রঙ-গন্ধ সবই আলাদা। ব্যতিক্রমধর্মী। ততক্ষণে গাড়ি নরসিংদী পৌঁছাল। সে আমায় টাটা দিলো। বিদায়ের হাতনাড়া। মনে হচ্ছে, কলজেটাকে হাত দিয়ে জোরে জোরে নাড়ছে। আমাদের চোখে হালকা জলের সরোবর। মোবাইলে কথা হবে ইশারা করে সে নেমে পড়ে। আমি তার প্রস্থানপথে তাকিয়ে আছি। সেও ফিরে আমায় দেখছে। ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠল। চলে যাচ্ছে দু’জন দুই দিকে। কথা হবে আঙুলে লেখা প্রেমের ঠিকানায়।

রায়পুরা, নরসিংদী সূত্র: নয়া দিগন্ত

 

Share.

Comments are closed.