বাড়ির সবার হৈ-হুল্লোড় আর চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙল মিনুর। বেড থেকে নেমে চোখ মুছতে মুছতে বাইরে আসতেই মা, ভাবী ও বড় আপুর রান্না নিয়ে ব্যস্ততা দেখে মনে পড়ল আজ ঈদ। ঘুমিয়ে ভুলেই গেছে মিনু। যখন মনে পড়ল আজ ঈদ, তখন মিনু নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখল রাতে যে মেহেদি নিয়েছিল, সেটা কী রঙ দিয়েছে হাতে! হাতের দিকে তাকিয়ে এক দৌড়ে গিয়ে উঠল রান্নাঘরে। মা, ভাবী ও আপুকে ডেকে মেহেদির রঙ দেখাতে লাগল। রাতে ঘুমানোর আগে মিনুর ভাবী মনের মাধুরী মিশিয়ে সাজিয়ে দিয়েছিল তার দুই হাত। সুন্দর হাতে মেহেদির রঙ ফুটেছে দারুণ। নিজের হাত দেখে খুশিতে ফেটে পড়ল সে। সবাই একযোগে বলল, খুব সুন্দর হয়েছে। ভাবী, মা আর আপু একের পর এক আইটেম রান্না করে ডাইনিং টেবিল ভরে ফেলেছে। সেমাই, লুডলস, ফিরনি ও পায়েস।
আপু বলল, মিনু তোমার দুলাভাই তোমার জন্য একটা কিছু এনেছে; দেখো গিয়ে। কথা শেষ না হতেই মিনু দৌড় দিলো আপুর রুমে। দুলাভাই নাকডেকে ঘুমোচ্ছে। রুমের সবখানে তন্ন তন্ন করে খুঁজে কোথাও পেল না তার কাক্সিত বস্তুটি। অবশেষে উপায় না পেয়ে ওড়নার এক প্রান্ত মুড়িয়ে চিকন কাঠির মতো বানিয়ে চুপটি করে ঢুকিয়ে দিলো দুলাভাইয়ের নাকে। কয়েকবার দেয়ার পর হেকচি মেরে সজাক হলো দুলাভাই। মিনু অধীর আগ্রহে জানতে চাইল, গিফট কোথায়?
দুলাভাই একটু চালাকি করে বললÑ কিসের গিফট মিনু?
Ñ কেন আপু বলল, আপনি নাকি আমার জন্য একটা কিছু এনেছেন?
Ñ ওফফ! তোমার আপু বলেছিল আনতে, কিন্তু আমি আনতে পারিনি। তোমার কথা একদমই মনে ছিল না। সবার জিনিসপত্র কিনেছি, কিন্তু তোমারটাই মিসটেক হয়ে গেছে।
নিমেষেই মিনুর হাসিমাখা মুখটি মলিন হয়ে গেল। মাথা নিচু করে বেড থেকে নেমে রুম থেকে বের হতে উদ্ধত হলো। দরজার কাছে পৌঁছার ঠিক আগমুহূর্তে দুলাভাই বলে উঠল, মিনু আলমারির ওপরের প্যাকেটটা একটু পেড়ে দেখো তো, ওটার ভেতরে কী?
দুলাভাইয়ের কথা শুনেই মিনুর বুঝতে বাকি রইল না যে, এটিই মিনুর প্যাকেট। বাড়িতে সবার ছোট মিনু। দুলাভাই তাকে খুব ভালোবাসে ও আদর করে।
পায়ের ওপর ভর করে আলমারি থেকে প্যাকেট নিয়েই দৌড় দিলো রান্নাঘরে। সেখানে গিয়ে প্যাকেট খুলে সবাইকে দেখাল।
সবাই জানাল, সুন্দর হয়েছে। মিনুর ভাবী আস্তে করে বলে উঠল, বিশ্বসুন্দরীর মতো লাগবে মিনুকে। সবার কথায় মিনু খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়ে। এবার ঈদে মিনুর নতুন জামাকাপড় অন্য ঈদের চেয়ে একটু বেশি হয়েছে। বাবা কিনে দিয়েছে এক সেট, মা বাড়িতে কাপড়ওয়ালার কাছ থেকে সুন্দর কালারের কাপড় রেখে দর্জিবাড়ি থেকে বানিয়ে দিয়েছে জামা ও সালোয়ার। ভাবী বাজার থেকে কিনে দিয়েছে এক সেট; আর দুলাভাই আরেক সেটÑ সব মিলিয়ে তিন সেট। মিনুর খুশি সীমাহীন।
বাবা, ভাইয়া ও দুলাভাই গোসল সেরে পাঞ্জাবি-পায়জামা আর সুগন্ধি লাগিয়ে সেমাই-নুডলস খেয়ে মিনুকে সেলামি দিতে লাগল। প্রথমে দুলাভাই ২০০ টাকা মিনুর হাতে গুঁজে দিলো। ভাইয়া দিলো ৫০০ টাকা আর বাবা দিলো ১০০ টাকা। সবাই ঈদগাহের উদ্দেশে বের হয়ে পড়লেই মিনু, মিনুর ভাবী, আপা ও মা সবাই গোসল সেরে নামাজ পড়ে নতুন কাপড় পড়ল। মিনুকে সাজিয়ে দিলো মিনুর ভাবী। মিনু ভাবীকে বলল, তিনটি ড্রেসই পরবে সে আজ। কেননা সবার ড্রেস না পরলে কেউ যদি মনে কষ্ট পায়। সেজেগুজে রেডি হতে না হতেই ঈদগাহ থেকে ফিরে এলো সবাই। গোশত, খিচুড়ি সব কিছু রান্না শেষ হয়েছিল ততক্ষণে। বিকেলে মিনু তার মা, ভাবী ও আপার সাথে বের হলো তাদের পুরান বাড়ির উদ্দেশে। ওখানে মিনুর দুই কাকা থাকেন। চাচাতো বোনও আছে তিন-চার জন। বেশ কয়েক বছর আগে ওখান থেকে এসে মিনুরা এখানে বসবাস শুরু করেছে। ঘুরে ঘুরে চাচাতো বোনদের সাথে মজা করে সবাইকে নিয়ে বাড়ি ফিরল মিনুরা। অনেক রাত পর্যন্ত মজায় কেটে গেল। এভাবেই শেষ হলো মিনুর ঈদ। সূত্র: নয়া দিগন্ত
