আমার বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে-আদালত কে খালেদা জিয়া

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘মাননীয় আদালত আপনি নিশ্চয়ই দেখতে পাচ্ছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমার বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা মামলা-মোকদ্দমা দায়ের করা হয়েছে। জারি করা হয়েছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। প্রায় চার দশকের স্মৃতিবিজড়িত বসতবাড়ি থেকে আমাকে উচ্ছেদ করা হয়েছে।’

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাকে আমার বাসা ও রাজনৈতিক কার্যালয়ে বালির ট্রাক দিয়ে কয়েক দফায় দীর্ঘদিন অবরোধ করে রাখা হয়েছে। আমি আমার অফিসে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় সে সময় বিদ্যুৎ, পানি, টেলিফোন, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে।’

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করে আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে দ্বিতীয় দিনের মতো বক্তব্যে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এসব কথা বলেন।

রাজধানীর বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ ড. আখতারুজ্জামানের আদালতে দুপুর সোয়া ১২টা থেকে প্রায় এক ঘণ্টা বক্তব্য দেন খালেদা জিয়া। এরপর তিনি মুলতবি চেয়ে আদালতের কাছে ফের বক্তব্যের জন্য দিন প্রার্থনা করেন। আদালত আগামী ২ নভেম্বর এ মামলার শুনানির দিন ধার্য রেখেছেন।

খালেদা জিয়া বলেছেন, সেই অবরুদ্ধ অবস্থাতেই আমি মৃত্যু-সংবাদ পাই বিদেশে চিকিৎসাধীন আমার একটি সন্তানের। আর সেদিনই আমার এবং আমার সঙ্গে অবরুদ্ধদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ বানোয়াট একটি মামলা দায়ের করা হয়। অভিযোগ করা হয়, রাস্তায় গাড়ি পোড়ানো এবং বিস্ফোরক দিয়ে মানুষ হত্যার। অফিসে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায়ই নাকি আমরা এসব করেছি। এগুলো কি কোনো সভ্য ও মানবিক আচরণ?

খালেদা জিয়া বলেন, ‘মাননীয় আদালত, আপনি দেখেছেন, শাসক মহলের নির্দেশে আমার স্বাধীন চলাচল বিভিন্নভাবে ব্যাহত করা হয়েছে। প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে আমার ওপর বারবার হামলার ঘটনা সারা বিশ্ব দেখেছে। আমার ওপর সশস্ত্র আক্রমণ চালানো হয়েছে। আমার গাড়ির ওপর গুলি চালানো হয়েছে। আমার গাড়িবহরে সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। দলীয় নেতাকর্মী ও নিরাপত্তারক্ষীরা তাতে আহত হয়েছেন। সন্ত্রাসীরা কেউ আটক হয়নি। কোনো ঘটনার বিচার হয়নি আজ পর্যন্ত। আমার নাগরিক অধিকার হরণ করা হয়েছে বারবার। আমার বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে অসত্য ও কুৎসিত অপপ্রচার চালানো হয়েছে। এর কোনো কিছুই বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যাপার নয়। বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি এবং এ দেশের জনগণের বর্তমান সার্বিক দুর্দশার সঙ্গে আমার এসব হেনস্তা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত বলেই আমার সুদৃঢ় বিশ্বাস।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘মাননীয় আদালত, আমি যত সামান্য মানুষই হই না কেন, আমার প্রতি বর্তমান শাসক মহলের আচরণের কারণ, পটভূমি ও প্রেক্ষাপটের ব্যাপ্তি কিন্তু সামান্য নয়। দেশ-জাতির দুর্দশা থেকে এটিকে আলাদা করে দেখা যাবে না। কাজেই আলোচ্য মামলাটি দায়ের এবং এর সকল কার্যক্রম ও পরিণতি কেবল ফৌজদারি বিধিবিধান, আইন-কানুন ও বিচার-ব্যবস্থার মধ্যেই সীমিত নয়। পুরো বিষয়গুলো ব্যাখ্যা না করলে কেবল আইনগত খুঁটিনাটি দিক তুলে ধরে এই মামলাটির সঠিক চিত্র বিশদ ও নিখুঁতভাবে তুলে ধরা সম্ভব নয়। তাই মাননীয় আদালত, আমি আপনাকে অনুরোধ করব আমার কথাগুলো একটু শুনবেন। আমাকে সময় দেবেন, যাতে আমি আমার সব কথা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে পারি। যাতে আমি পুরো প্রেক্ষাপট ও পটভূমি তুলে ধরতে পারি। দেশের যে পরিস্থিতি, জাতির যে অবস্থা এবং ইতিহাসের যে ধারাক্রম আজকে এ ধরনের মামলা সৃষ্টি করেছে সে কথাগুলো আমাকে বলতেই হবে। না হলে আমার বক্তব্য ও জবাব অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। যে কথাগুলো না বললে সব কিছু স্পষ্ট ও পরিষ্কার হবে না, সেই কথাগুলো তো আমাকে এই সুযোগে বলতেই হবে।’

বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘প্রায় তিন যুগ আগে মানুষের ডাকে ও ভালোবাসায় সাড়া দিয়ে আমি রাজনীতির অঙ্গনে পা রাখি। সেদিন থেকেই বিসর্জন দিয়েছি নিজের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে। আমি কেন রাজনীতিতে এসেছিলাম? নিশ্চিত ও নিরাপদ জীবন ছেড়ে কেন আমি ঝুঁকিপূর্ণ অনিশ্চিত পথে পা দিয়েছিলাম? তখন আমার সামনে মসনদ কিংবা ক্ষমতার কোনো হাতছানি ছিল না।’

খালেদা জিয়া বলেন, ‘রাষ্ট্রক্ষমতার অবৈধ দখলদাররা চায়নি আমি রাজনীতিতে থাকি। আমি রাজনীতি না করলে তারা আমাকে অনেক বেশি সম্মান ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা বলেছিল। রাজনীতি করলে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হবে বলে আমাকে ভয়-ভীতিও দেখানো হয়েছিল। সবকিছু উপেক্ষা করে আমি রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখি।’

কারণ, দেশে তখন গণতন্ত্র ছিল না। জনগণের নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করে নেওয়া হয়েছিল। জনগণের অধিকার ছিল না। গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শুরু থেকেই আমাকে রাজপথে নামতে হয়েছিল। তিনি বলেন, আমি রাজনীতিতে এসেছিলাম শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শের পতাকা হাতে নিয়ে। আমার সংগ্রাম শুরু হয়েছিল তাঁর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার লক্ষ্য নিয়ে। আমি সব সময় চেয়েছি, বাংলাদেশ যেন গণতান্ত্রিক পথে পরিচালিত হয়। মানুষের যেন অধিকার থাকে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকে। বিচার বিভাগ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা থাকে। আমি চেয়েছি, আমাদের অর্থনীতি যেন শক্তিশালী হয়। বিশ্বসভায় বাংলাদেশ মর্যাদার আসন পায়। সেই লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্যই আমার রাজনীতি।’

খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমি রাজনীতিতে যোগ দিয়ে দেশ ও জনগণের ভাগ্যের সঙ্গে নিজের ভাগ্যকে একাকার করে ফেলেছি। আমার নিজের কোনো পৃথক আশা-আকাঙ্ক্ষা নেই। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাই আমার আশা-আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়েছে।’

এরপর আজকের মতো বক্তব্য শেষ বলে খালেদা জিয়া সময় আবেদন করেন। পরে আদালত ২ নভেম্বর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন।

এর আগে গত ১৯ অক্টোবর দুই মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থন করে বিশেষ আদালতে আংশিক বক্তব্য উপস্থাপন করেন খালেদা জিয়া। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক হারুন-অর-রশিদ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক বাসুদেব রায়।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন—খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী (পলাতক), হারিছের তখনকার সহকারী একান্ত সচিব ও বিআইডব্লিউটিএর নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান।

এ ছাড়া জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলা করে দুদক।

২০১০ সালের ৫ আগস্ট খালেদা জিয়া ও তাঁর ছেলে তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন দুদকের উপপরিচালক হারুন আর রশিদ। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ খালেদা জিয়াসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক বাসুদেব রায়।

মামলায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন—মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান।

Recent Posts

১৯০টি দেশে মুক্তি পাচ্ছে ধানুশের নতুন সিনেমা

অবশেষে মুক্তি পেতে যাচ্ছে তামিলের জনপ্রিয় তারকা ধানুশের সিনেমা। বহুল প্রতীক্ষিত এ সিনেমার নাম ‘জগমে…

6 months ago

এবার ঝড় তুলেছে সালমানের ‘দিল দে দিয়া’

অনেক প্রতীক্ষার পর অবশেষে গত ২৬ এপ্রিল মুক্তি পেয়েছে সালমান-দিশা জুটির বহুল প্রতীক্ষিত সিনেমা ‘রাধে…

6 months ago

৩২ বছর পর সিনেমায় সালমানের চুমু!

প্রভুদেবা পরিচালিত এবং সালমান খান অভিনীত ব্যাপক আলোচিত সিনেমা ‘রাধে’র ট্রেইলার মুক্তি পেয়েছে বৃহস্পতিবার (২২…

6 months ago

নেটফ্লিক্সের ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমছে

জনপ্রিয় ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সের নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। গত বছরের প্রথম প্রান্তিকের…

6 months ago

টস হেরে ফিল্ডিংয়ে বাংলাদেশ

সিরিজের প্রথম টেস্টে সমানে সমান লড়ে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম পয়েন্ট পেয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল।…

6 months ago

২৪ ঘণ্টায় ৭৮ জনের মৃত্যু

দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত আরও ৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ পর্যন্ত করোনায় দেশে…

6 months ago