সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের পদগুলোতে রদবদল করা হয়েছে। রেজিস্ট্রার জেনারেল, হাইকো
র্টের রেজিস্ট্রার, অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার, ডেপুটি রেজিস্ট্রার পর্যায়ের দশ বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সাথে পরামর্শক্রমে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের এসব কর্মকর্তাকে দেশের বিভিন্ন জেলা আদালতে বদলি করেছে আইন মন্ত্রণালয়। প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা ছুটিতে যাওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে এই রদবদল আনা হলো।
গত ৩ অক্টোবর এক মাসের ছুটিতে যান প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা। এই ছুটি শেষ না হতেই গত ১০ অক্টোবর ছুটির মেয়াদ আরো দশদিন বৃদ্ধি করেন প্রধান বিচারপতি। শুক্রবার রাতে তিনি অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। দেশ ত্যাগের পূর্বে এক খোলা চিঠিতে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের রদবদল নিয়ে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা বলেছেন, “বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আমি একটু শংকিতও বটে। কারণ গতকাল প্রধান বিচারপতির কার্যভার পালনরত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রবীণতম বিচারপতির উদ্বৃতি দিয়ে মাননীয় আইনমন্ত্রী প্রকাশ করেছেন যে, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি অচিরেই সুপ্রীম কোর্টের প্রশাসনে পরিবর্তন আনবেন। প্রধান বিচারপতির প্রশাসনে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কিংবা সরকারের হস্তক্ষেপ করার কোনো রেওয়াজ নেই। তিনি শুধুমাত্র রুটিন মাফিক দৈনন্দিন কাজ করবেন। এটিই হয়ে আসছে। প্রধান বিচারপতির প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করলে এটি সহজেই অনুমেয় যে, সরকার উচ্চ আদালতে হস্তক্ষেপ করছে এবং এর দ্বারা বিচার বিভাগ ও সরকারের মধ্যে সম্পর্কের আরো অবনতি হবে। এটি রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না।”
প্রধান বিচারপতির এই বক্তব্যের বিষয়ে সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা আইনমন্ত্রীর বক্তব্য জানতে চান। জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি যা যা করতে পারেন, ভারপ্রাপ্ত বা অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি তাই করতে পারেন। এটাই সংবিধানে বলা আছে। যদি কোনো প্রশাসনিক পরিবর্তন আনতে চান তবে সেটাও তিনি করতে পারেন। সংবিধান তাকে সে ক্ষমতা দিয়েছে। তাই প্রধান বিচারপতির যে বক্তব্য দিয়েছেন তা আইন সংগত নয়।
প্রসঙ্গত সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হইলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে প্রধান বিচারপতি তাহার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে ক্ষেত্রমত অন্য কোনো ব্যক্তি অনুরূপ পদে যোগদান না করা পর্যন্ত কিংবা প্রধান বিচারপতি স্বীয় কার্যভার পুনরায় গ্রহণ না করা পর্যন্ত আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারকের মধ্যে যিনি কর্মে প্রবীণতম, তিনি অনুরূপ কার্যভার পালন করিবেন।” সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গত ২ অক্টোবর আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারক বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে প্রধান বিচারপতির কার্যভার পালনের দায়িত্ব দেন রাষ্ট্রপতি। গত ১১ অক্টোবর ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্ করেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। সাক্ষাত্ শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি প্রশাসনিক রদবদল করবেন। সেগুলো আমাকে অবহিত করেছেন। এর প্রায় এক সপ্তাহ পর সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলোতে রদবদল করা হলো।
গতকাল রবিবার আইন মন্ত্রণালয় থেকে জেলা জজ, অতিরিক্ত জেলা জজ ও যুগ্ম জেলা জজ ও সমপর্যায়ের ২৫ কর্মকর্তাকে বদলির প্রস্তাব সুপ্রিম কোর্টে পাঠানো হয়। ওই প্রস্তাব যাচাই-বাছাই শেষে তাতে অনুমোদন দেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি। এরপরই তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয়। পরে আইন মন্ত্রণালয় বদলি সংক্রান্ত পৃথক পৃথক সরকারি আদেশ জারি করে।
আইন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলামকে ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের (ঢাকা) চেয়ারম্যান পদে, হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার আবু সৈয়দ দিলজার হোসেনকে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত, অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার মোঃ যাবিদ হোসেনকে রংপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক, অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার (বিচার ও প্রশাসন) মোঃ সাব্বির ফয়েজকে লালমনিরহাটের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, প্রধান বিচারপতির একান্ত সচিব মোঃ আনিসুর রহমানকে পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, আপিল বিভাগের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার অরুনাভ চক্রবর্তীকে সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল অফিসার এ ই এম ইসমাইল হোসেনকে বরগুনার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, হাইকোর্টের ডেপুটি রেজিস্ট্রার (প্রশাসন ও বিচার) মোঃ আজিজুল হককে ঠাকুরগাঁওয়ের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ, ডেপুটি রেজিস্ট্রার বেগম ফারজানা ইয়াসমিনকে পিরোজপুরের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ এবং ডেপুটি রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ কামাল হোসেন শিকদারকে চুয়াডাঙ্গার যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে বদলি করা হয়েছে।