জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট
দুর্নীতির অভিযোগ ও জাতীয় পতাকার মানহানির পৃথক দুটি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে ঢাকার দুটি আদালত। গতকাল বৃহস্পতিবার এই পরোয়ানা জারি করা হয়।
এছাড়া কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে দুই বছর আগে বাসে পেট্রল বোমা মেরে আটজনকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় বিস্ফোরক আইনের মামলায় গত ৯ অক্টোবর খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে কুমিল্লার আদালত। লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপি প্রধানের বিরুদ্ধে এ নিয়ে এক সপ্তাহে চার দিনের ব্যবধানে মোট তিনটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করল আদালত।
দলীয় প্রধানের বিরুদ্ধে তিনটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে। বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, অশুভ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের ‘হুকুমে’ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এই পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। এই পরোয়ানা জারি সরকারের কূট ছক বাস্তবায়নের পরিকল্পনার অংশ। খালেদা জিয়া যাতে দেশে ফিরতে না পারেন- সে জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পরোয়ানা জারি করা হয়েছে বলেও তারা অভিযোগ তুলেছেন।
গতকাল দুটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির প্রতিবাদে বিএনপি আগামীকাল শনিবার সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এছাড়া আগামীকাল যুবদল সব জেলা-মহানগরে বিক্ষোভ এবং ছাত্রদল সব জেলা-মহানগর-বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ সমাবেশের কর্মসূচি দিয়েছে। জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল আগামীকাল সব জেলা-মহানগর এবং রবিবার থানায়-থানায় বিক্ষোভ সমাবেশ করবে।
গতকাল দুপুরে পরোয়ানা জারির পর বিকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী শনিবারের বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করে বলেন, যখন উনার (খালেদা জিয়া) লন্ডন থেকে দেশে ফেরার সময় হয়ে এসেছে, ঠিক তখন ওয়ারেন্ট জারি একেবারেই অশুভ পরিকল্পনার অংশ। এটা বুঝতে বাংলাদেশের মানুষের কষ্ট হয় না। আমরা মনে করি, জামিন বাতিল করে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি সরকারের ক্রমাগত এক কুটিল ছক বাস্তবায়নের অংশ। উল্লেখ্য, চলতি মাসের শেষদিকে খালেদা জিয়া দেশে ফিরতে পারেন বলে বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা আভাস দিয়েছিলেন।
লন্ডনে চিকিত্সাধীন খালেদা জিয়ার চিকিত্সা সনদ আদালতে উপস্থাপনের কথা তুলে ধরে রিজভী বলেন, সবই আদালত জানে। কিন্তু হঠাত্ করে ৩-৪ দিনের মধ্যে শুরু হয়েছে মিথ্যা মামলাগুলোতে ওয়ারেন্ট জারির হিড়িক। এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতই শুধু নয়, বিরাট কারসাজি সরকারের।
গত জুলাই থেকে লন্ডনে অবস্থানরত খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়াও অভিযোগ করেছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন যাতে দেশে আসতে না পারেন, সে জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে এক দিনে দুই মামলায় সরকার এভাবে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করিয়েছে।
গ্রেফতারি পরোয়ানা
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে হাজির না থাকায় গতকাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ মো. আখতারুজ্জামান। সেই সঙ্গে এ মামলার অপর দুই আসামি মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল ওরফে ইকোনো কামাল ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদের জামিন বাতিল করে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন তিনি।
আর স্বাধীনতাবিরোধীদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়ে দেশের মানচিত্র এবং জাতীয় পতাকার মানহানি করার অভিযোগে আরেক মামলায় সমন জারির পরও আদালতে না আসায় বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ঢাকার মহানগর হাকিম নূর নবী। পরোয়ানা জারির প্রতিবাদে বিএনপি সমর্থক জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে আদালতপাড়ায় বিক্ষোভ মিছিলও করেছে।
এতিমখানা দুর্নীতি
বিগত জরুরি অবস্থার সরকারের সময় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ?্যগ্রহণ শেষে খালেদা জিয়ার আত্মপক্ষ সমর্থনের কথা ছিল চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি। কিন্তু দফায় দফায় তার আইনজীবীদের সময়ের আবেদন ও অনাস্থার কারণে এখন পর্যন্ত সেই শুনানি হয়নি।
এর মধ্যে খালেদা জিয়া চিকিত্সার জন্য গত ১৫ জুলাই লন্ডনে যান। এ মামলার আরেক আসামি খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানও গত নয় বছর ধরে লন্ডনে অবস্থান করছেন। এদিকে নয় বছর আগের একটি রুল শুনানি করে গত ৯ আগস্ট এতিমখানা দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে স্থায়ী জামিন দেয় হাইকোর্ট। রায়ে বলা হয়, স্থায়ী জামিন দেওয়া হলেও তিনি এর অপব্যবহার করলে বিচারিক আদালত জামিন বাতিল করতে পারবে।
মানচিত্র ও পতাকার মানহানি
আওয়ামী লীগ সমর্থক সংগঠন ‘জননেত্রী পরিষদ’-এর সভাপতি এ বি সিদ্দিকীর করা মানহানির মামলায় সমন জারির পরও খালেদা জিয়া আদালতে হাজির না হওয়ায় মহানগর হাকিম নূর নবী তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন।
২০১৬ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকার হাকিম আদালতে এবি সিদ্দিকীর করা এ মামলার আর্জিতে বলা হয়, স্বীকৃত স্বাধীনতাবিরোধীদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়ে খালেদা জিয়া দেশের মানচিত্র এবং জাতীয় পতাকার মানহানি ঘটিয়েছেন। ঢাকা মহানগর হাকিম রায়হানুল ইসলাম সেদিন বাদীর আর্জি শুনে তেজগাঁও থানা পুলিশকে অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্ত শেষে তেজগাঁও থানার পরিদর্শক (তদন্ত) এ বি এম মশিউর রহমান চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি যে প্রতিবেদন দেন তাতে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়।