২৩শে অক্টোবর, ২০২১ ইং | ৭ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | শনিবার | ভোর ৫:৪২

আন্তর্জাতিক মহলের উপর চাপ বৃদ্ধির জন্য জাতীয় সংসদে উত্তপ্ত আলোচনা

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর নির্যাতন বন্ধ, নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত করে বাংলাদেশে পুশইন করা থেকে বিরত থাকতে এবং তাদেরকে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের উপর জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের জোরালো কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ। গতকাল সোমবার সংসদে আনীত এই সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবের উপর সরকারি, বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সদস্যদের দীর্ঘ আলোচনা শেষে সেটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।আলোচনায় অংশ নেয়া সদস্যরা রোহিঙ্গাদের উপর বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানান। নির্যাতনের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় তারা শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সু চি’র কড়া সমালোচনা করেন। আন্তর্জাতিক আদালতে এই নির্যাতনের বিচার এবং কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত কমিশনের সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জন্য ‘নিরাপদ অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার দাবি তোলেন তারা। এছাড়া আলো-চকদের অনেকে শান্তি ও মানবতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নোবেল পুরস্কার পাওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন।
সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ১৪৭ বিধিতে প্রস্তাবটি (সাধারণ) আনেন চাঁদপুর-৩ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। তিনি তার প্রস্তাবে বলেন,  ‘সংসদের অভিমত এই যে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর অব্যাহত নির্যাতন-নিপীড়ন বন্ধ, নিজ বাসভূম থেকে বিতাড়ন করে বাংলাদেশে পুশইন করা থেকে বিরত থাকা এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে নাগরিকত্বের অধিকার দিয়ে নিরাপদে বসবাসের ব্যবস্থা গ্রহণে মিয়ানমার সরেকারের ওপর জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের জোরালো কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানানো হউক।’
প্রস্তাবের উপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ বলেন, সরকার এই মুহূর্তে মানবিক সংকট মোকাবেলা করছে। স্রোতের মত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে। এর একটি স্থায়ী সমাধান দরকার। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। রোহিঙ্গারা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে, এটা আমাদের দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়। কারণ এরসঙ্গে অস্ত্রও আসছে। শান্তিতে নোবেল পাওয়া সু চি কীভাবে এরকম কাজ করতে পারেন সেটি ভেবে অবাক হয়ে যাই। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা আমাদের মেহমান। তাদেরকে মানুষ হিসেবে আমরা জায়গা দিয়েছি। তবে আজ হোক কাল হোক তাদের নিজ দেশে চলে যেতে হবে। রোহিঙ্গারা যাতে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। অনেকে এটা নিয়ে রাজনীতি করতে পারে, সেই সুযোগ দেয়া যাবে না। জাতিসংঘের আসন্ন সাধারণ অধিবেশনে এ বিষয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী বলেন, রাখাইনে এবারের নির্যাতন অতীতের সকল নির্যাতনের মাত্রা ছাড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ নিচ্ছেন। আমরা ইতিমধ্যে আঞ্চলিক, দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক সকল ফোরামের কাছে সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরেছি।
পার্টির সভাপতি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, এটাকে আমি সহিংসতা বলবো না, এটা পুরোপুরি গণহত্যা।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল মতিন খসরু বলেন, রোহিঙ্গাদের অপরাধটা কি? হাজার হাজার বছর ধরে তারা সেখানে অবস্থান করছে। সারা পৃথিবী আজ তাকিয়ে দেখছে। মিয়ানমার সারা পৃথিবীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। সারাবিশ্ব আজ শেখ হাসিনার প্রশংসা করছে। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম, যারা গণতন্ত্র ও মানবতার কথা বলে তারা আজ মিয়ানমারের সঙ্গে অস্ত্র চুক্তি করেছে।
প্রস্তাবটি উত্থাপন করে দীপু মনি বলেন, সম্প্রতি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর অব্যাহত নির্যাতন-নিপীড়ন চরম আকার ধারণ করায় সেখানকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর লাখ লাখ লোক ইতোমধ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আশ্রয় নিয়েছে। সীমান্তের প্রতিটি পয়েন্টে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নিষ্ঠুর নির্মমতার শিকার-কেউ অর্ধমৃত, কেউ গুলিবিদ্ধ, কেউ বা আবার ক্ষত-বিক্ষত হাত-পা নিয়ে কোন মতে জীবন নিয়ে ঢলের মতো প্রতিদিন বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। নাফ নদীতে ভাসছে সারি সারি রোহিঙ্গার লাশ। নিজ ভূমি থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে জাতিগত ভাবে নির্মূলের লক্ষ্যে চালানো অব্যাহত নৃশংসতায় গর্ভবতী মা-বোন, কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ এমনকি দুগ্ধপোষ্য শিশুকেও রেহাই দিচ্ছে না এসব বাহিনী। তাদেরকে আখ্যায়িত করা হচ্ছে ‘বাঙ্গালী সন্ত্রাসী’ হিসেবে। বাঙ্গালী অজুুহাতে এদের কেবল বিতাড়িত করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না তারা, রোহিঙ্গাদের প্রতিটি বাড়ি-ঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছে যাতে তারা আর কখনোই নিজ ভূমিতে ফিরতে না পারে।
তিনি আরও বলেন, মানবিক কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার দুর্দশাগ্রস্ত এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশে আশ্রয় দিযেছে। রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও চিকিত্সাসহ অন্যান্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রেখেছে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে জাসদ একাংশের কার্যকরী সভাপতি মইন উদ্দিন খান বাদল বলেন, অং সান সু চি শান্তি ও গণতন্ত্রের বারোটা বাজিয়েছেন। বাঙালিদের এই পার্লামেন্ট বিশ্বকে জানাতে চায়, মুসলমান হিসেবে রোহিঙ্গাদের আমরা জায়গা দিই নাই, মানুষ হিসেবে জায়গা দিয়েছ। দ্বিতীয় বার্তা- রোহিঙ্গারা আমাদের জাতিগোষ্ঠী নয়, মিয়ানমারের জাতিগোষ্ঠী। তৃতীয় বার্তাটি হলো- মিয়ানমার বিশ্বের কাছে মিথ্যাচার করছে। বিশ্বের পন্ডিত ও মোড়লদের উদ্দেশে বলতে চাই, আপনাদের আচরণে এখন নৈতিকতার কোনো সামঞ্জস্য নেই। বিশ্ব আজ সঠিক আচরণ করতে না পারলে কাল এটা আপনাদের ঘরে যাবে। আমার প্রস্তাব হচ্ছে, সার্বিয়ান আর্মিদের সরিয়ে দিয়ে যেভাবে কসোভোর জন্ম হয়েছে. একইভাবে মিয়ানমারেও ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে খাদ্য ও আশ্রয় দিতে গিয়ে নিজেদের যেন ক্ষতি না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে বিপদমুক্ত রাখুন, আমরা সংঘাত চাই না, কারণ বাঙালি ভেসে আসেনি। জাসদের আরেকাংশের (ইনু) সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার বলেন, এই সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেন, আরাকানে রোহিঙ্গাদের উপর যে নৃশংসতা হচ্ছে তা মধ্যযুগীয় নৃশংসতাকেও হার মানিয়েছে। জীবন্ত শিশুকে পায়ের তলায় পিষ্ট করে হত্যা করা হচ্ছে, গর্ভবতী নারীদের হত্যা করা হয়েছে। অং সান সূচির নেতৃত্বাধীন মিয়ানমার সরকার বলছে-বাঙালী সন্ত্রাসী। আসলে কত সংখ্যক রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে সেটির সঠিক হিসাব নেই। তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সারাবিশ্ব আজ শেখ হাসিনার প্রশংসা করছে, সেখানে বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
কক্সবাজারের আওয়ামী লীগের এমপি সায়মুন সারোয়ার কমল বলেন, এই বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় আজ বিশ্ববিবেক নাড়া দিয়েছে। অথচ অং সান সু চি নিরব। বিশ্ববিবেক যখন চুপ, তখন মানবতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন শেখ হাসিনা। সেজন্য শেখ হাসিনা নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। ১৪ দল শরিক তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভান্ডারি বলেন, ৮ থেকে ৯ লাখ রোহিঙ্গা বর্তমানে বাংলাদেশে বসবাস করছেন। জামায়াত যাতে এই রোহিঙ্গাদের নিয়ে ষড়যন্ত্র করতে না পারে, সেজন্য সজাগ থাকতে হবে। বিএনপি রোহিঙ্গাদের নিয়ে এত উত্তেজিত কেন? শেখ হাসিনা আজ বিশ্বনেতায় পরিণত হয়েছেন। শান্তি ও মানবতার জন্য শেখ হাসিনা নোবেল পুরস্কার পেতে পারেন। সরকারি দলের সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) আবদুল ওয়াহাব বলেন, এই বর্বরতা মেনে নেয়া যায় না।

Share.

Comments are closed.