খিলগাও থানাধীন দক্ষিণ বনশ্রীতে লাইলী বেগম (৩৫) নামে এক গৃহকর্মীর রহস্যজনক মৃত্্য হয়েছে। এ ঘটনার জের ধরে গৃহকর্মীকে হত্যার অভিযোগ এনে সহস্রাধিক মানুষ একটি বাড়ি ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছে। বিক্ষোভকারীরা ৭ তলা ওই বাড়ির জানালা-দরজার কাচ ভাঙচুর করে। বাড়ির পাশে রাখা একটি প্রাইভেট কার জ্বালিয়ে দেয়। তাদের ইটপাটকেল নিক্ষেপে পুলিশের মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার সাইফুল ইসলামসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ৫০ রাউন্ড টিয়ারশেল ছুড়ে বলে জানা গেছে।গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বনশ্রীর বি-ব্লকের ৪ নম্বর রোডের ১৪ নম্বর বাড়ি ঘিরে এসব ঘটনা ঘটে। বাড়িটির মালিক সাবেক ভ্যাট কর্মকর্তা মাইনুদ্দীন মুন্সী বর্তমানে বেসরকারি নাসির গ্রুপে কর্মরত। লাইলী বেগম তার বাসাতেই কাজ করতেন। এ ঘটনায় পুলিশ গৃহকর্তা মাইনুদ্দীন ও বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক টিপুকে আটক করেছে।
খিলগাঁও থানার ওসি কাজী মাইনুল ইসলাম বলেন, লাইলী বেগম খিলগাঁওয়ের ভূঁইয়াপাড়ার হিন্দুপাড়া বস্তিতে থাকতেন। তিনি বনশ্রীর মাইনুদ্দীন মুন্সীর বাড়িতে ছুটা বুয়া হিসেবে কাজ করতেন। প্রতিদিন সকালে তার বাসায় গিয়ে রান্না ও ঘর পরিষ্কার করতেন। গতকাল সকাল ১০টার দিকে গৃহকর্তা পুলিশকে ফোন করে জানান যে তার বাসার ছুটা বুয়া বাড়ির নিচতলায় দারোয়ানের কক্ষে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছে। খবর পেয়ে পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। পুলিশ গিয়ে দেখতে পায় ওই বাড়িটি শতাধিক বস্তিবাসী ঘেরাও করে রেখেছে। তারা পুলিশকে বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি।
হিন্দুপাড়া বস্তির বাসিন্দা আফরোজা বেগম জানান, লাইলীর স্বামী নজরুল ইসলাম ভারতের কারাগারে বন্দি। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি উপজেলার কাশীপুর গ্রামে লাইলীর বাড়ি। মরিয়ম (৫) ও আতিক (২) নামে লাইলীর দুটি সন্তান রয়েছে। একজন মানসিক প্রতিবন্ধী। লাইলী ছুটা বুয়ার কাজ করে যা পেতেন তা দিয়ে সংসার চলত। এরই মধ্যে লাইলীর তিন মাসের বেতন বকেয়া পড়ে যায়। বকেয়া বেতন চাইতে তিনি সকাল ৯ টার দিকে ওই বাড়িতে যান। সাত তলা বাড়ির দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাটে গৃহকর্তা থাকেন। বেতন চাইলে গৃহকর্তা তাকে গালমন্দ করে বাসা থেকে বের করে দেন। বাড়ির নিচতলায় আসার পর দারোয়ান দিয়ে তাকে চড়-থাপ্পড় মারা হয়। এতে সেখানেই লাইলী অচেতন হয়ে পড়ে যান। পড়ে বাড়ি থেকে একটি হাসপাতালে ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে পাঠানো হয়। অ্যাম্বুলেন্স বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই লাইলী না ফেরার দেশে চলে যান। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে বনশ্রীর আশেপাশের বিভিন্ন বস্তি থেকে শত শত মানুষ জড়ো হতে থাকে ওই বাড়ির সামনে।জানা গেছে, সকাল ১০টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে লাইলীকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিত্সকরা জানান, অনেক আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, লাইলীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বস্তিবাসীরা ওই বাড়ির সামনে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা বাড়ি লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। থেমে থেমে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ফলে ওই বাড়ির জানালা-দরজার বেশিরভাগ কাঁচ ভেঙে যায়। বেলা ১২টার দিকে বস্তিবাসীরা বাড়ির প্রবেশ করে দরজা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে।
খবর পেয়ে মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে ৩ প্লাটুন পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পুলিশ বস্তিবাসীদের শান্ত করার চেষ্টা করলে তাদের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এসময় পুলিশ বস্তিবাসীদের ওপর টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। পরে বেলা ৩টার দিকে বস্তিবাসীরা লোহার রড ও শাবল দিয়ে আবারো বাড়িটিতে হামলা চালায়। এক পর্যায়ে প্রবেশ গেটের ছোট গেটটি ভেঙে ফেলে।
ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, বিকাল সোয়া ৪টার দিকে উচ্ছৃঙ্খল জনতা ওই বাড়ির পাশে রাখা একটি প্রাইভেট কারে আগুন ধরিয়ে দেয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট গিয়ে আগুন নিভিয়ে ফেললেও প্রাইভেট কারটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়। প্রাইভেট কারটির মালিক ছিলেন মাইনুদ্দীন মুন্সী। পরে বিক্ষোভকারীরা সেখানে টেলিফোনের ক্যাবল প্যাঁচানো একটি কাঠের চাকায় আগুন ধরিয়ে দেয়।এর আগে দুপুরেই পুলিশ ওই বাড়ি থেকে গৃহকর্তা ও তত্ত্বাবধায়ককে আটক করে খিলগাঁও থানায় নিয়ে যায়। পুলিশের কাছে গৃহকর্তা মাইনু্দ্দীন মুন্সী বলেন, লাইলী প্রতিদিন সকালে কাজ করতে বাসায় আসে। কিন্তু গতকাল বাসায় এসে নিচ তলার একটি রুমের ভেতর ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। ডাকাডাকিতে দরজা না খুললে বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক টিপুকে তিনি ডেকে পাঠান। পরে দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে দেখতে পান লাইলী সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলছে। ওই অবস্থায় ওড়না কেটে তাকে নিচে নামানো হয়। তিনি নিজেই অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। কিন্তু চিকিত্সকরা জানান, লাইলী মারা গেছে।দক্ষিণ বনশ্রী বাড়ি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হক বলেন, তিনি জানতে পেরেছেন যে গৃহকর্তা দারোয়ানকে দিয়ে লাইলীকে চড়-থাপ্পড় মারেন। এতে লাইলী ঘটনাস্থলে অচেতন হয়ে পড়েন। হয়তো এভাবেই তিনি মারা যেতে পারেন। তবে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
