২৩শে অক্টোবর, ২০২১ ইং | ৭ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | শনিবার | ভোর ৫:২৫

প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগের স্বার্থেই রাজনৈতিক বক্তব্য দেবেন,

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, হাইকোর্টে বিচারকের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেয়া না থাকায় প্রতিটি রাজনৈতিক সরকার ইচ্ছেমতো হাইকোর্টে বিচারক নিয়োগ দিয়ে থাকে। সময় আসছে হাইকোর্টে বিচারক সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেয়ার। তিনি বলেন, বিচারকের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেয়া থাকলে রাজনৈতিক প্রভাব কমে যায়। এই রাজনৈতিক প্রভাব যতোই কমবে ততোই বিচার বিভাগের জন্য মঙ্গল। সদ্য অবসরে যাওয়া আপিল বিভাগের বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার আজীবন সম্মাননা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। শনিবার বাংলাদেশ মহিলা জজ এসোসিয়েশন সুপ্রিম কোর্ট অডিটরিয়ামে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। প্রধান বিচারপতি বলেন, আমাদের দেশে মামলার পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিচারক নিয়োগ দেয়া হয় না। বিশ্বের প্রত্যেকটি দেশে মামলার সংখ্যানুপাতে বিচারক নিয়োগ দেয়ার বিধান আছে। ভারতের তুলনায় আমাদের এখানে অর্ধেক বিচারক। তিনি বলেন, ইউএসএতে সুপ্রিম কোর্টে ৯ জন বিচারক। ইচ্ছে করে সরকার সেখানে এর বেশি বিচারক নিয়োগ দিতে পারে না। একটা কনভেনশন (রীতি) চলে আসছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টে বিচারকের সংখ্যাও নির্ধারণ করে দেয়া আছে। আর আমাদের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারকের সংখ্যা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এখন বিচারক কমে ৬ জনে দাঁড়িয়েছে। এরপর আগামী বছর এই সংখ্যা ৪ জনে গিয়ে দাঁড়াবে। তখন কোনো রিভিউ পিটিশন আসলে বিচারকের অভাবে সেটি শুনানি করা সম্ভব হবে না। এসব বিবেচনা করে সরকারকে বলবো বিচার বিভাগ অকেজো হওয়ার আগে এটিকে টিকিয়ে রাখতে বিচারক নিয়োগ দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। আইনমন্ত্রীর উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, সরকার যদি মনে করে প্রধান বিচারপতি রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছে তাহলে আমি বলবো ‘হ্যাঁ’। প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগের স্বার্থেই রাজনৈতিক বক্তব্য দেবেন, বিচারকদের অবস্থা ও বিচার বিভাগের উন্নয়নের জন্য প্রধান বিচারপতি আরো বলবেন। এ ব্যাপারে আমি দ্বিধান্বিত হবো না।
জাতীয় বাজেটে বিচার বিভাগের বরাদ্দ কমিয়ে দেয়ার সমালোচনা করে প্রধান বিচারপতি বলেছেন, গত তিন বছরে সুপ্রিম কোর্টের উন্নয়ন বরাদ্দের জন্য একটি টাকাও দেয়া হয়নি। অর্থমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছিলাম, কিন্তু অজ্ঞাত কারণে কোনো টাকা বরাদ্দ হয়নি। অথচ জাতীয় সংসদের জন্য উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ হয়েছে ১৬ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এছাড়া সন্ত্রাসের কারণে দেশের সব জায়গায় নিরাপত্তা দেয়ার জন্য বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। গত বছরের বাজেট থেকে এবারের বাজেটে বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এভাবে বাজেটের বরাদ্দ প্রত্যাহার করে একেবারে ‘শূন্য’ করে দেয়া হচ্ছে। এই যদি হয় অবস্থা তাহলে বিচার বিভাগ চলবে কিভাবে? এটা দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গলজনক নয়। প্রধান বিচারপতি বলেন, হাইকোর্টে ৯৫ জন বিচারক ছিল। কমতে কমতে সেটি এখন ৮৫ জনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছর শেষে এটি ৮০তে গিয়ে দাঁড়াবে। আপিল বিভাগেও বিচারক সংকট রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আমাকে বলেছেন হাইকোর্টে নারী বিচারক নিয়োগ দেয়ার জন্য। সরকার যদি এগিয়ে আসে তাহলে কালকেই বিচারক নিয়োগ দেয়া সম্ভব। তিনি বলেন, উচ্চ আদালতের ৯০ ভাগ বিচারক নিয়োগ করা হয় আইনজীবীদের মধ্য থেকে। বিচারক হিসেবে এদের পরিপক্ব হয়ে উঠতে ও রায় লিখতে ৫/৬ বছর লেগে যায়। পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশে উচ্চ আদালতের বিচারকদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু আমরা সেটি করতে পারিনি। আমাদের এখানে সীমিত পরিসরে নিম্ন আদালতের বিচারকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে। প্রশিক্ষণের অভাবে বিচারকদের বিচারের মান নিম্নগামী হচ্ছে।
আইনমন্ত্রীর উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, বৃষ্টি হলে সুপ্রিম কোর্টের মূল ভবনটির বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে প্রধান বিচারপতির এজলাস ও খাস কামরার ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। এখানে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড রুম। স্থান সংকুলানের অভাবে এই ভবনের বারান্দায় হাইকোর্টের বিচারকদের জন্য খাস কামরা করা হয়েছে। যেখানে দু’জন বিচারককে একসঙ্গে বসতে হয়। হাইকোর্টের এ্যানেক্স ভবনটিও ভঙ্গুর অবস্থায়। এই বিবেচনায় ২০ তলা একটি প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের জন্য প্রস্তাব করা হয়। যেটি প্রি-একনেকে পাস হয়ে একনেকের বৈঠকে গেলে অজ্ঞাত কারণে তা ফেরত পাঠানো হয়। তিনি বলেন, যে পরিমাণে বৃষ্টিপাত হচ্ছে এবং মূল ভবনটি ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে তাতে মনে হয় এটি বেশিদিন টিকবে না। এই ভবন ভেঙে পড়লে কি অবস্থা দাঁড়াবে বলা মুশকিল? তাই আপনার মাধ্যমে সরকারকে বলছি শুধু সুপ্রিম কোর্ট কেন পুরো বিচার বিভাগের যে অবস্থা সেটি বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসনিক ভবনের প্রকল্পটি যাতে একনেকে পাস হয় সেদিকে দৃষ্টি দিন।
অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা এদেশের বিচার বিভাগের অহংকার। তিনি প্রথম নারী যিনি ১৯৭৫ সালে প্রথমবারের মতো পুরুষ বিচারকের পাশাপাশি যোগদান করেছিলেন বিচার বিভাগে। আর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার উজ্জ্বল পথচলায় সমৃদ্ধ হয়েছে বিচার বিভাগ। তাকে অনুসরণ করে অনেক নারীর পদার্পণ ঘটেছে আমাদের বিচার বিভাগে। ফলস্বরূপ আজ বাংলাদেশের মোট বিচারকের প্রায় ২৪ ভাগই হলেন নারী। প্রতিবেশী সকল  দেশের তুলনায় বাংলাদেশে নারী বিচারকের এই হার অনেক বেশি। এমনকি পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশের চেয়েও এই হার উৎসাহব্যঞ্জক। আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন।
অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জেলা জজ তানজীনা ইসমাইলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আপিল বিভাগের বিচারক বিচারপতি মো. ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ ও অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি হোসনে আরা আকতার। অনুষ্ঠানে বিচারপতি নাজমুন আরাকে আজীবন সম্মাননার ক্রেস্ট তুলে দেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এবং উত্তরীয় পরিয়ে দেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

Share.

Comments are closed.