২৩শে অক্টোবর, ২০২১ ইং | ৭ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | শনিবার | ভোর ৫:২৩

হবিগঞ্জে ৪ শিশু হত্যা মামলায় ৩ জনের ফাঁসি

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

হবিগঞ্জ বাহুবলের সুন্দ্রাটিকি গ্রামে চার শিশু হত্যা মামলায় রায়ে ৩ জনের ফাঁসির রায় ঘোষণা হয়েছে। একই সঙ্গে আরো দুজনকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়। গতকাল দুপুরে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মকবুল আহসান এ রায় ঘোষণা করেন। মামলার রায়ে প্রধান আসামি আব্দুল আলী বাগালসহ ৩ জনকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছে। এদিকে রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের পিপি অ্যাডভোকেট কিশোর কুমার কর তার প্রতিক্রিয়ার জানিয়েছেন- রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ আংশিক খুশি। প্রধান আসামি আব্দুল আলী বাগালের শাস্তি হয়নি। তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায় ঘোষণার পর তারা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন। আর আসামি পক্ষের আইনজীবী শফিউল আলম বলেছেন, তারা সংক্ষুব্ধ। পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর তারা নির্ধারিত তারিখের মধ্যে আপিল করবেন। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তরা হচ্ছে, প্রধান আসামি আব্দুল আলী বাগালের ছেলে রুবেল মিয়া, বাগালের সহযোগী হাবিবুর রহমান আরজু ও উস্তার মিয়া। এর মধ্যে রুবেল ও আরজু ঘটনার পর থেকে কারাগারে রয়েছে। আর উস্তার মিয়া পলাতক রয়েছে। রায়ে তিনজনকে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানাও প্রদান করা হয়েছে। ৭ বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হচ্ছে আব্দুল আলী বাগালের ছেলে জুয়েল মিয়া ও ভাতিজা সাহেদ ওরপে সায়েদ। তাদের ৫ হাজার টাকা করে জরিমানা প্রদান করা হয়েছে। এই দুজন গ্রেপ্তার রয়েছে। এছাড়া খালাসপ্রাপ্তরা হচ্ছে- আব্দুল আলী বাগাল, পলাতক থাকা বিল্লাল মিয়া ও বাবুল মিয়া। গতকাল রায় ঘোষণাকালে আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিল আব্দুল আলী বাগাল, তার ছেলে রুবেল মিয়া, জুয়েল মিয়া, ভাতিজা সাহেদ ও সহযোগী হাবিবুর রহমান আরজু। বাহুবলের সুন্দ্রাটিকির ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচিত ঘটনা। ঘাতকরা গত বছরের ১২ই ফেব্রুয়ারি খেলার মাঠ থেকে অপহরণ করেছিল গ্রামের আবদাল মিয়া তালুকদারের ৭ বছরের ছেলে মনির মিয়া, ওয়াহিদ মিয়ার ৮ বছরের ছেলে জাকারিয়া আহমেদ শুভ, আব্দুল আজিজের ১০ বছরের ছেলে তাজেল মিয়া ও আব্দুল কাদিরের ১০ বছর বয়সী ছেলে ইসমাইল হোসেনকে। মনির সুন্দ্রাটিকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে, তার দুই চাচাত ভাই শুভ ও তাজেল একই স্কুলে দ্বিতীয় ও চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত। আর তাদের প্রতিবেশী ইসমাইল ছিল সুন্দ্রাটিকি মাদরাসার ছাত্র। ঘটনার দিনই শিশু মনিরের পিতা আব্দাল মিয়া বাহুবল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। ১৭ই ফেব্রুয়ারি গ্রামেই মাটিচাপা অবস্থায় ওই চার শিশুর লাশ পাওয়া গেলে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। শোকে কাতর হয়ে পড়েন হবিগঞ্জবাসী। এ ঘটনায় পুলিশ আব্দাল মিয়ার দায়ের করা জিডিকে মামলা হিসেবে রেকর্ড করে। ঘটনার দুই মাসের মাথায় ২৯শে এপ্রিল গোয়েন্দা পুলিশের ওসি মুক্তাদির হোসেন ৯ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন। অভিযুক্তদের মধ্যে সিএনজিচালক বাচ্চু মিয়া বন্দুকযুদ্ধে মারা যায়। বাকি ৮ আসামির মধ্যে উস্তার, বেলাল ও বাবুল মিয়া শুরু থেকেই পলাতক রয়েছে। এ ঘটনা জুয়েল, রুবেল, সাহেদ ও আরজু হবিগঞ্জ আদালতে স্বীকারোক্তিমুল জবানবন্দি দেয়। এরপর প্রথমে হবিগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালে মামলাটির বিচার শুরু হয়। পরবর্তীকালে মামলাটির বিচার কার্যক্রম স্থানান্তরিত করা হয় হবিগঞ্জ জজ আদালতে। ওই দুই আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণকালে মোট ৫২ জন সাক্ষীর মধ্যে ৪৩ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। মামলাটি দ্রুত বিচারের স্বার্থে চলতি বছরের ১৫ই মার্চ হবিগঞ্জ আদালত থেকে স্থানান্তরিত করা হয় সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মকবুল আহসানের আদালতে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটি গুরুত্ব সহকারে নিয়ে দ্রুত বিচার শেষ করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এরপর বাকি থাকা আরও ৯ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৫২ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের পর চার দিন আদালতে যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে আসামি পক্ষের আইনজীবীরা তিনদিন জেরা ও যুক্তি খণ্ডনের সুযোগ পান। ১৮ই জুলাই দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলার কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর গতকাল রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেন বিচারক। আর জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করা হয়। মোট ২০ কার্যদিবসের মধ্যে এই মামলায় রায় ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা। তারা বলেন, সিলেটের রাজন, সাঈদ হত্যা মামলার মতো এই মামলাটি গুরুত্ব সহকারে নিয়ে বিচারকাজ শেষ করা হয়েছে। সিলেটের আদালতে আসার পর এই বিচারকাজে সরকারপক্ষের কৌঁসুলিরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। একই সঙ্গে বিচার যাতে দীর্ঘ না হয় সে ব্যাপারেও তারা সহায়তা করেছেন। রায় ঘোষণার পর আদালত থেকে বেরিয়ে সিলেট জজ কোর্টের পিপি অ্যাডভোকেট মিসবাহউদ্দিন সিরাজ জানিয়েছেন, ‘আলোচিত এ মামলা সিলেটে আসার পর আমরা গুরুত্ব সহকারে নেই। তিনজনের ফাঁসির রায় হওয়ায় আমরা সন্তুষ্ট। তবে প্রধান আসামি বাগালের শাস্তি না হওয়ার বিষয়টি আমরা পূর্ণাঙ্গ রায় ঘোষণার পর বিশ্লেষণ করবো।’ তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দেশে যে আইনের শাসন কায়েম করেছে এই রায় তার একটি প্রমাণ।’ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের পিপি কিশোর কুমার  জানিয়েছেন- ‘রায়ে আমরা আংশিক খুশি। আমরা বাগালের শাস্তি চেয়েছিলাম। সেটি হয়নি। কেন হয়নি- পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর বিশ্লেষণ করবো।’ তিনি বলেন- ‘আসামিরা যে দোষী সেটি আমরা আদালতে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি।’ তবে- মামলার রায়ের অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন আসামি পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শফিউল আলম। তিনি বলেন, রায়ে আসামিদের বিরুদ্ধে অন্যায় করা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর তারা উচ্চ আদালতে আপিল করবেন বলে জানান। এদিকে ৪ শিশুর রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সিলেটের আদালতপাড়ায় নিশ্চিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। আদালতে সবকটি ফটকে পুলিশ মোতায়েন ছিল। রায় শুনতে আদালতের বাইরে মানুষজন জড়ো হন। তবে হবিগঞ্জ থেকে আদালতে আসেননি মামলার বাদী আব্দাল মিয়া। অন্য শিশুর পিতামাতা ও স্বজনরা আদালতে আসেননি। সকাল ৯টার দিকে আব্দুল আলী বাগালসহ অপর চার আসামিকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আদালতের হাজতখানায় নিয়ে আসা হয়। আর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে বেলা পৌনে ১১টার দিকে তাদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নিয়ে আসা হয়। বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে রায় ঘোষণা করতে আদালতে উঠেন বিচারক মকবুল হোসেন মিয়া। তিনি মাত্র ৫ মিনিটেই রায় ঘোষণা করে আবার খাস কামরায় চলে যান। এ সময় আদালতে সিলেটের পিপি অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, এডিশনাল পিপি অ্যাডভোকেট শামসুল ইসলাম, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের পিপি অশোক কুমার করসহ অর্ধশতাধিক আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। রায় ঘোষণার পর ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। আব্দুল আলী বাগাল ছিলেন নির্বিকার। তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। রায় ঘোষণার ১০ মিনিটের মধ্যেই তাদের পুলিশি পাহারায় গাড়িতে তুলে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।
চার শিশু হত্যা মামলার রায়ে সন্তুষ্ট নয় তাদের পরিবার। রায় শোনার পর থেকে কাঁদছেন সবাই। নিহত ইসমাইলের মা মিনারা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমরা ২ বছর বিচারের লাগি অপেক্ষা কইরা কিতা পাইলাম। ৯ জনের মাঝে একটা মরছে, বাকি ৮টার ফাঁসি চাই। অয় তারারে ফাঁসি দেও, নাইলে আমরারে ফাঁসি দেও। একইভাবে নিহত অপর ৩ শিশুর পরিবারের সদস্যরাও ‘৮ আসামির ফাঁসি’ দাবি করেছেন। মামলার রায় ঘোষণার পর দুপুরে নিহত ৪ শিশুর বাড়ি গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। নিহতের পরিবারের সদস্যদের আর্তচিৎকারে এলাকার আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন নিহত শিশুদের দাদী মরমচানসহ তাদের মা।  বেলা ২টার দিকে তাদের বাহুবল হাসপাতালে আনা হয়। অসুস্থদের মাঝে ইসমাইলের মা মিনারা (৪৫) ও দাদী মরমচান (৬০)কে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাজেলেরর মা চন্দ্র বানু (৪০), মনিরের মা সুলেমা (৪০)কে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।
বাদী আবদাল মিয়ার প্রতিক্রিয়া: মামলার বাদী আবদাল মিয়া বলেন, যে রায় হইছে, এ রায়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। মেইন আসামি আবদুল আলী অর্ডার দিয়া মারাইল, হে-ঐ খালাস পাইলায়। তার পুলাইনত্যা মারল, তারারে দিল খালাস, দুইজনরে দিল কারাদণ্ড। ৭ দিনও লাগত নায়, আব্দুল আলী তারারে লইয়া বারঅইয়া (বের হয়ে) আইব। আইয়া আবার আমরারে কাটব, আমরারে মারব। ৪টা বাইচ্চা মাইরা যদি আইত পারল, আমরা বুড়া মানুষরে মারলে কোন আর তারার সমস্যা হইবনি? ২/৪টারে মারবই। তিনি বলেন, তারা (আসামিরা) জেল থাইক্যাও কইছে- ‘আমরা আইয়া লই তোমরারে কচুর মতো কাটমো। ৪ টারে মারছি আরো ৮/১০টারে মারমো। আমরা আতঙ্কে রয়েছি।মানবজমিন

Share.

Comments are closed.