২৩শে অক্টোবর, ২০২১ ইং | ৭ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | শনিবার | ভোর ৫:২১

একটানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম এখন কোমর পানিতে!

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

রাত থেকে টানা বৃষ্টি। সকাল হতেই নগরবাসী দেখলো পানিতে তলিয়ে গেছে পুরো নগরী। কোথাও হাঁটু সমান। আবার কোথাও কোমর পর্যন্ত। তাও একটি-দুইটি এলাকা নয়। চট্টগ্রামের অন্তত ২৫/৩০টি এলাকার লাখ লাখ মানুষ এখন পানিবন্দি। গতকাল সকালে  মেয়র, ফায়ার সার্ভিস ও নানা সমাজসেবী সংগঠনের মানুষজন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দিনভর কাজ করেও পানি সরাতে পারেননি দেশের দ্বিতীয় রাজধানী খ্যাত চট্টগ্রামে।  বরং টানা বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত জলাবদ্ধতা আরো প্রকট থাকার ধারণ করে। সোমবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘন্টায় ১৫১ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করার কথা জানিয়েছেন পতেঙ্গা আবহাওয়া অধিদপ্তর।
এদিকে প্রবল বৃষ্টিতে আবারও পাহাড় ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গতকাল বৃষ্টিতে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে পানিতে পড়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে সর্বশেষ ২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিচু এলাকায় পানি জমায় রমজানে মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। অনেকে অফিসে যেতে পারেননি। শহরের বেশির ভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিচতলায়  পানি ঢুকে পড়ায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ দেখা গেছে। কোনো কোনো এলাকায় নৌকায় ইফতার সামগ্রী ও প্রয়োজনীয় পানীয় সরবরাহ করতে দেখা গেছে স্থানীয়দের।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মেয়র আজম নাছির উদ্দিন বলেছেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে তিনি আন্তরিকার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে সৃষ্ট এই সমস্যা একদিনে নিরসন করা সম্ভব নয়। তবে আগামী বছরের মধ্যেই একটা সুফল পাবেন নগরবাসী-সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জানিয়েছেন তিনি।
তলিয়ে গেছে শহরতলী
চট্টগ্রামে প্রবল বর্ষণে তলিয়ে গেছে শহরের অলিগলি। জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে নগরজুড়ে। অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ নেই। গ্যাস সংযোগ বন্ধ। বন্দরে পণ্য উঠানামার কাজও চলছে ধীরগতিতে। সাগরের অবস্থা অনুকূলে না থাকায় জাহাজগুলো বন্দরের কাছাকাছি রয়েছে। চরমে পৌঁছেছে ভোগান্তি। চট্টগ্রামে টানা বৃষ্টিতে অচলাবস্থার সৃষ্টি হতে পারে বলে ধারণা সচেতন নগরবাসীর। সরজমিনে দেখা গেছে, শহরের অন্তত ছোট বড় ২৫/৩০টি এলাকায় জমে গেছে বৃষ্টির পানি। পানিবন্দি মানুষজন জানান, সারাদিনের বৃষ্টিতে অনেকে বাসা থেকে বের হতে পারেননি। এতে খাবার সংকটে বেশির ভাগ বাসিন্দাকে ভুগতে হয়েছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় অনেক নিচু এলাকায় হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমেছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকা সকাল থেকেই ছিল বিদ্যুৎহীন।
নগরীর ষোলশহর, চান্দগাঁও, মুরাদপুর, আগ্রাবাদ, পতেঙ্গা, হালিশহর, বিবিরহাট, চকবাজার, কাতালগঞ্জ, মুরাদপুর, দুই নম্বরগেইট, চান্দগাঁও, বাকলিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
একই রকম চিত্র দেখা গেছে কাপাসগোলা, কেবি আমান আলী েরাড, বাকলিয়া সৈয়দ শাহ রোড, রাহাত্তার পুল, বাকলিয়া, পুরাতন চান্দগাঁও থানা, বহদ্দারহাট ফরিদের পাড়া, মোহাম্মদপুর, সুন্নীয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন এলাকায়ও।
সিডিএ এভিনিউ রোডের ষোলশহর দুই নম্বর গেইট মোড় থেকে মুরাদপুর পর্যন্ত এবং আরাকান রোডের পুরাতন চান্দগাঁও থানার সামনের রাস্তায় পানি জমে বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল। এতে সড়কের উভয়পাশে যানজট দেখা দেয়।
জলাবদ্ধতার প্রভাব পড়েছে দেশের অন্যতম ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জেও। সেখানকার বেশির ভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ায় বন্ধ রাখা হয়েছে লেনদেন। সাগর উত্তাল থাকায় বহিঃনোঙ্গরে দুটি সিমেন্টের ক্লিংকারবাহী দুটি জাহাজ সাগরে ডুবে গেছে।

এদিকে টানা বৃষ্টিতে নগরীর বিভিন্ন এলাকা সরজমিনে পরিদর্শন করেছেন মেয়র আজম নাছির উদ্দিন। এক বিবৃতিতে মেয়রের একান্ত সচিব জানান, প্রবল বর্ষণ ও অতি জোয়ারের কারণে চট্টগ্রাম নগরীর নিম্নাঞ্চলে জলজট সৃষ্টির মধ্য দিয়ে নাগরিক দুর্ভোগ দেখাদেয়। জলৃজটের কারণে সৃষ্ট নাগরিক দুর্ভোগ স্বচক্ষে সরেজমিনে দেখার জন্য গতকাল সোমবার সকালে হালিশহর বড়পোল এলাকাসহ জলমগ্ন কয়েকটি এলাকায় ছুটে যান চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।
তিনি জলমগ্ন এলাকায় পানিতে দুর্ভোগ কবলিত আশপাশ এলাকার অধিবাসীদের সাথে সরাসরি সাক্ষাত করেন এবং তাদের মতামত জেনে দুঃখ প্রকাাশ করেন। মেয়র বলেন, উত্তরাধিকার সূত্রে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা এবং প্রাকৃতিক ও জলবায়ু প্রভাবে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা স্থায়ীভাবে নিরসনের লক্ষ্যে পানি উন্নয়নবোর্ড ও পাওয়ার চায়নার মাধ্যমে পৃথক পৃথক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। এছাড়াও বিশ্ব ব্যাংকের সহযোগিতায় চট্টগ্রাম ওয়াসা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন মাস্টার ড্রেনেজ ও সুয়ারেজ সিস্টেম চালু করতে যাচ্ছে। এই সকল পরিকল্পনার মাধ্যমে কর্ণফুলী নদী থেকে নগরীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সকল খাল খনন, খালের দুই পাড়ে রাস্তা ও দৃষ্টি নন্দন সবুজায়ন এবং খালের প্রবেশ মুখে পাম্প হাউজ সহ স্লুইস গেইট নির্মাণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
দু’জনের মর্মান্তিক মৃত্যু
টানা বৃষ্টিতে বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে চট্টগ্রামে মারা গেলো এক শিশুসহ দুইজন। এই ঘটনায় আরও একজন গুরুতরভাবে আহত হয়ে এখন হাসপাতালে। নিহতদের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলো- পাঁচলাইশ থানার বাদুরতলা এলাকার রবিউল করিম (৪০) ও নগরীর হালিশহরের রামপুরা এলাকার রাজু নামের ১২ বছর বয়সী এক শিশু। এই ঘটনায় রবিউলের স্ত্রী রোকসারা বেগম (৩০) এখন আহত হয়ে একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন।
স্থানীয়রা জানান, হালিশহরের রামপুরা এলাকায় সকালে খেলতে গিয়ে মারা যায় শিশু রাজু। এই সময় বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে যায় সে। অন্যদিকে রবিউল ও তার স্ত্রী থাকতেন ইলিয়াছ কলোনীতে। রবিউল কাজ করেন একটি গ্যারেজের নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে। সোমবার সকালে ডিউটি করে  ফেরার সময় বাসার বাইরে বিদ্যুতের তারে তিনি স্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। তার স্ত্রীও তাকে বাঁচাতে গিয়ে আহত হয়েছে। রবিউল ঘরের সামনে বিদ্যুতের তার পড়ে থাকতে দেখে তা সরাতে গিয়ে মৃত্যুর কবলে পড়েন। রাত ২-০০মিনিটে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত থেমে থেমে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষন হচ্ছিল। আবহাওয়া অফিস সুত্র ঈঙ্গিত দেয় আগামি দুইদিন একই অবস্থা চলতে পারে।

Share.

Comments are closed.