মোঃ আলাউদ্দীন,হাটহাজারী প্রতিনিধিঃ
সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওর অঞ্চলের দুর্ভোগের
শিকার অসহায় মানুষের পাশে যার যার সাধ্যমত সহযোগিতা নিয়ে দাঁড়ানোর আহবান
জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলামের আমীর শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী। তিনি
বলেন, ইসলাম সাম্য, সহমর্মিতা ও মানবতার শিক্ষা দেয় এবং মুসলমান পরস্পর
ভাই ভাই। সুতরাং ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে অসহায় মানবতার পাশে সহযোগিতা নিয়ে
স্বচ্ছল জনসাধারণকে দাঁড়ানো নৈতিক দায়িত্ব। ব্যক্তিগত বা সম্মিলিত
উদ্যোগে যার যার এলাকায় ত্রাণসামগ্রী, নগদ অর্থ ও খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ করে
হাওর এলাকায় বিলি-বণ্টনের উদ্যোগ নিন।
আল্লামা শাহ আহমদ শফী বলেন, হাওর এলাকার লাখ লাখ চাষি ফসল হারিয়ে এখন
নিঃস্ব। ভারি বৃষ্টি ও সীমান্তের ওপার থেকে ধেয়ে আসা পানির সয়লাবে তাদের
সকল আশা ও ভবিষ্যৎ ভেসে গেছে। হাওরের বিপুল মৎস্য সম্পদ ও হাঁস এই
নিদানকালে তাদের খুবই কাজে আসতে পারতো। কিন্তু সেই আশাও তাদের শেষ হয়ে
গেছে। রহস্যজনক কারণে হওরের মাছ, হাঁস সবই মরে সাফ হয়ে যাচ্ছে। এমন ভয়াবহ
দুর্যোগময় সময়ে হাওরবাসীর চোখেমুখে চরম অসহায়ত্ব ফুটে ওঠেছে। ইতোমধ্যে
খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে সেই অঞ্চলে। আগামী চৈত্র ছাড়া বছর ব্যাপী তাদের
ফসল পাওয়ার সুযোগ নেই। এই সময় পর্যন্ত তাদের খাদ্যসহ সকল প্রয়োজনীয়
উপকরণের চিন্তায় সেখানকার মানুষের দুঃশ্চিন্তা ও হতাশার শেষ নেই।
হেফাজত আমীর বলেন, হাওরের দূর্গত অঞ্চলে সরকারকে যেমন সকল প্রকার সহায়তা
নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে, তেমনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, সেবা
সংস্থা ও ব্যক্তিগত উদ্যোগেও ত্রাণ সংগ্রহ করে দুর্গত মানুষের পাশে গিয়ে
দাঁড়াতে হবে। এখানে গড়িমসি করার যেমন অবকাশ নেই, তেমনি রাজনৈতিক কাঁদা
ছোঁড়াছুড়িরও কোনো সুযোগ নেই। দুঃখজনক হলেও বলতে হচ্ছে, ইতোমধ্যে রাজনৈতিক
কাঁদা ছোঁড়াছুড়ির শুরু হয়ে গেছে। তিনি বলেন, দূর্গত মানুষদের জন্য
কার্যকর সহযোগিতার পরিবর্তে রাজনৈতিক হাতিয়ার করা চরম অমানবিকতা।
রাজনৈতিক দলসমূহ মানবিকতাবোধের পরীক্ষায় বার বার ব্যর্থ হলে সাধারণ মানুষ
তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। হেফাজত আমীর দেশের আলেম সমাজকেও যার যার
সাধ্যমতো হাওরবাসীর সহযোগিতায় ভূমিকা রাখার আহবান জানান।
তিনি বলেন, সরকারের তরফে কিছু ত্রাণ-সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে, যা
প্রয়োজনের তুলানায় মোটেই যথেষ্ট নয়। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত
ত্রাণসামগ্রী দেয়ার পাশাপাশি কম দামে খাদ্য ও অতি প্রয়োজনীয় সামগ্রী
বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে। চাষিরা ব্যাংক ও মহাজনী ঋণ নিয়ে ফসল আবাদে
বিনিয়োগ করছিল। এখন এই ঋণের কি হবে, সেটাও সদয় বিবেচনায় নিতে হবে। এই
সঙ্গে আগামীতে আবাদঘাটের জন্য নগদ অর্থ ও উপকরণের প্রয়োজন হবে, তার আয়োজন
ও বন্দোবস্তের পথও বের করতে হবে। সোমবার(২মে) বিকেলে গণমাধ্যমে দেওয়া এক
বিবৃতিতে হেফাজত আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফী উপরোক্ত আহবান জানান।
অপরদিকে ফেনী জেলা হেফাজতে ইসলামের নেতৃবৃন্দসহ ২০ সদস্যের একটি
প্রতিনিধি দল কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদীসের সনদের মান অর্জনে সফল
নেতৃত্বের জন্য আল্লামা শাহ আহমদ শফীকে অভিনন্দন জানাতে সোমবার ২ মে বেলা
১২টায় তার কার্যালয়ে এসে সাক্ষাত করেন। এ সময় ফেনী জেলা হেফাজতের সভাপতি
মাওলানা আবুল কাসেম ভূঁইয়া এবং সেক্রেটারী মাওলানা মুফতী রহিমুল্লাহ
কাসেমী দেশের আলেম সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদীসের
সনদের মান অর্জনে সফল নেতৃত্বদানে হেফাজত আমীরের প্রশংসনীয় ভূমিকা ও
অবদানের উল্লেখ করে বক্তব্য দেন। এরপর ফেনী জেলা হেফাজতের পক্ষ থেকে
আল্লামা শাহ আহমদ শফীকে ক্রেস্ট প্রদান করে কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।
প্রতিনিধি দলের সদস্যদের মধ্যে আরো ছিলেন, মাওলানা জাকির আহমদ চৌধুরী,
মাওলানা হুসাইন আহমদ, মাওলানা মুফতী আবুল কাসেম, মাওলানা নূরুল হুদা,
মাওলানা আজিজুল্লাহ, মাওলানা আনোয়ারুল্লাহ ভূঁঞা, মুফতী শোয়াইব, মাওলানা
ইউসুফ, মাওলানা আইয়ূব, মাওলানা হুসাইন, মাওলানা জালালুদ্দীন ফারুক,
মাওলানা আবুল খায়ের মাসুম, মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ, মাওলানা মুহাম্মদ
আব্দুল মান্নান, মাওলানা আব্দুল হান্নান, মুফতী মাহমুদুল হাসান, মাওলানা
একরামুল হক, মাওলানা নূরুল ইসলাম, মাওলামান মুহাম্মদ উসমান, মাওলানা
ইমরান প্রমুখ।
এ সময় আল্লামা শাহ আহমদ শফী ফেনী জেলা হেফাজত নেতৃবৃন্দের উদ্দেশ্যে
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ছোটখাটো ভেদাভেদ ও মতপার্থক্য দূর করে
সর্বাবস্থায় উলামায়ে কেরামের ঐক্য দৃঢ় রাখতে হবে। তিনি বলেন, সবসময়
ওলামায়ে কেরাম ও তৌহিদী জনতার বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমি কাজ
করে আসছি। এই ঐক্য গড়ে তোলার স্বার্থে অনেক সময় আমার নিজস্ব মতামত ও
সিদ্ধান্তেও ছাড় দিয়ে থাকি। কারণ, ওলামায়ে কেরাম ও তৌহিদী জনতার ঐক্যবদ্ধ
মজবুত অবস্থান ছাড়া বর্তমানের বহুমুখী ইসলাম বিদ্বেষী ষড়যন্ত্রের
বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা অনেক কঠিন।
আল্লামা শাহ আহমদ শফী আরো বলেন, কওমি মাদ্রসার সনদ নিয়ে বেফাক ও অন্যান্য
আঞ্চলিক কওমি বোর্ডসমূহের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গড়ে তোলার লক্ষ্যে দীর্ঘ দিন
থেকেই আমি চেষ্টা করে আসছি। আর সেই চেষ্টার সুফল হিসেবে গত বছরের ১০
ডিসেম্বর দারুল উলূম হাটহাজারী মাদ্রাসায় বেফাকসহ অপরাপর ছয় বোর্ডের
শীর্ষ কর্মকর্তাগণ দীর্ঘ এক বৈঠকে মিলিত হয়ে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণ করে।
যা ফলস্বরূপ কওমি মাদ্রাসার স্বতন্ত্র ও স্বাধীন বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে ও
দারুল উলূম দেওবন্দের মূলনীতিসমূহকে ভিত্তি ধরে সরকার নিয়ন্ত্রিত কোন
কমিটি, কমিশন, বিদ্যমান কারিকুলাম পরিবর্তন ও মাদ্রসা পরিচালনায় কোনরূপ
সরকারী হস্তক্ষেপ ছাড়া কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদের মাস্টার্স
(ইসলামিক স্টাডিজ ও এবং আরবি)এর সমমানের দাবী অর্জিত হয়।