আমি বাবার কাছে সম্পদ চাই না। কোনো দিন তার কাছে আসিনি, আগামীদিনেও আসব না। শুধু আমায় একবার ছেলে বলে ডাকুক। আমাকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করুক। আমি শুধু পিতৃপরিচয়ের অভাবে বিদেশ যেতে পারছি না। সমাজে কোনো দাম পাই না।’- এমন করুণ আর্তি নরসিংদীর মনোহরদী থানার মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল আউয়ালের পুত্র এমদাদুল হকের। তিনি বলেন, বাবার কাছে পিতৃপরিচয়ের জন্য গেলে আমাদের তিনি অস্বীকার করেন। বলেছেন, ‘তোমরা আমার কেউ না। কোনো দিন তোমার মাকে আমি বিয়ে করিনি। এমন ঘটনার মুখোমুখি হয়ে যে কাজী আমার বাবা-মায়ের বিয়ে পড়িয়েছেন, তার কাছে গিয়ে আমি আমার মায়ের বিয়ের কাবিননামা উঠিয়েছি। কাবিননামার কথা জানালে আমাকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন। আমার আগের পক্ষের ভাইবোনদের মধ্যে এক ভাই ও দুই বোন রয়েছেন। বড় ভাই পুলিশে চাকরি করেন। দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। বোনজামাইকে দিয়ে আমাকে মারপিটও করেছেন। এখন যে এলাকায় বাসাভাড়া করে থাকি, সেখানেও আমাদের থাকতে দিচ্ছেন না। বিভিন্নভাবে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন। স্থানীয় প্রশাসন ও চেয়ারম্যানের কাছে গেলে তারাও আমাকে সহযোগিতা করতে পারেনি। সবাই বলে তোমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা। এখানে আমরা কিছুই করতে পারব না। মুক্তিযোদ্ধা আউয়ালের বিয়ের কাবিননামায় দেখা যায়, ১৯৮৬ সালের ২৬শে মে ১৫ হাজার টাকা দেনমোহরে বিয়ে করেন কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার রাজাবাড়ী কেন্দুঘর এলাকার মৃত মজিবুর রহমানের মেয়ে মোসাম্মাদ নূরজাহান বেগমকে। তখন পিতা-মাতা হারা নূরজাহানের বয়স ছিল ১৮ বছর। বিয়ের কাবিন করা হয় মাধবপুর ইউনিয়ন, ব্রাহ্মণপাড়া, কুমিল্লা কাজী অফিস থেকে। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার মাধবপুর ইউনিয়ন কাজী অফিসের কাজী মাও. মো. আ. রহমান বিয়ে পড়ান। বিয়েতে বর পক্ষের সাক্ষী ছিলেন মো. খোরশেদুল আলম এবং বরের উকিল ছিলেন মো. আব্দুল খালেক। কন্যাপক্ষের উকিল মো. শাহ আলম। কাবিননামায় আব্দুল আউয়ালের দেয়া তথ্যে দেখা যায়, নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার দিঘাকান্দি গ্রামের মৃত মো. আকরাম আলীর ছেলে তিনি।
কাবিননামায় দেয়া মেয়ে পক্ষের সাক্ষী শাহ আলম জানান, বিয়ে হয়েছিল। অনেক দিন সংসারও করেছেন তারা। তাদের ঘরে দুই সন্তানও হয়। পরে আব্দুল আওয়াল নূরজাহানকে রেখে চলে গেছেন। দুই ছেলেকে মানুষ করেছেন মা নিজেই। যে কাজী বিয়ে পড়িয়েছিলেন তার বয়স অনেক বেশি হওয়ায় ১০-১২ বছর আগে কাজীর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। যোগাযোগ করা হলে কাজী মুক্তিযোদ্ধা মো. আ. রহমান মানবজমিনকে জানান, নূরজাহান আমার গ্রামের মেয়ে। আব্দুল আওয়াল বিয়ের আগে অনেক দিন আমাদের এলাকায় ছিল। প্রথমে বিয়ে করতে চাইলে গ্রামবাসী কেউ রাজি হয়নি। অনেক দিন ঘোরাঘুরি করেছে গ্রামের মাতব্বরদের দ্বারে দ্বারে। পরে গরিবের মেয়ে পাত্রস্থ হলে ভালো দেখে সবাই রাজি হয়েছেন এবং সবাই মিলে আয়োজন করে বিয়ে দেয়া হয়েছে। আমি নিজে বিয়ে পড়িয়েছিলাম। কিন্তু বিয়ের কয়েক বছর পর দুটা ছেলেসহ নূরজাহানকে ফেলে চলে যায় আব্দুল আউয়াল। পরে চট্টগ্রাম গিয়ে গার্মেন্টে কাজ করে ছেলে দুটাকে মানুষ করেছে। দিঘাকান্দি গ্রামের মেম্বর মো. হিরোন জানান, আমি বিষয়টি জানি না। তবে ছেলেটি আমার কাছে আসলে তাকে নিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করার চেষ্টা করবো। মনোহরদী থানার টিএনও মো. শহীদুল্লাহ বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে ছেলেটি মায়ের কাবিননামাসহ একটি লিখিত দরখাস্ত নিয়ে আমার কাছে আসলে আমি আন্তরিকভাবে বিষয়টি মীমাংসা করার চেষ্টা করবো। নরসিংদীর মনোহরদী চেয়ারম্যান মো. শামীম বলেন, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আওয়ালের একটা ছেলে আছে পুলিশের এসআই। আর কোনো বউ ছেলে-মেয়ে আছে কি না, সেটা আমার জানা নেই। আমার কাছে এব্যাপারে কেউ আসেনি। যোগাযোগ করা হলে আব্দুল আওয়াল বলেন, তারা আসুক, আসলে সবকিছু বলবো। এখন কিছু বলতে পারবো না বলে টেলিফোন কেটে দেন।
