আংশিক কমিটি ঘোষণার দীর্ঘ চার মাস পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) শাখা ছাত্রলীগের এক বছর মেয়াদি কমিটি পূর্ণাঙ্গ করে ঘোষণা করা হয়েছে। এ কমিটিতে স্থান পেয়েছেন ভর্তি জালিয়াতি, নারী নিপীড়ন, শিক্ষক লাঞ্ছনা, ছিনতাই, নিজ দলের কর্মীকে মারধর, সাধারণ শিক্ষার্থী মারধর, বাকি খেয়ে টাকা না দেওয়া, দোকানিকে মারধর, জমি দখলের অভিযোগে অভিযুক্ত এবং বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয় ও ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃতরাও।
গতকাল শুক্রবার রাতে জাবি শাখা ছাত্রলীগের ২১৫ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ কমিটি ঘোষণা করা হয়।
এর আগে গত বছরের ২৭ ডিসেম্বরে এই কমিটির সভাপতি মো. জুয়েল রানা ও সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান চঞ্চলের নাম ঘোষণা করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ সূত্রে জানা যায়, সহসভাপতি মিনহাজুল আবেদীন ও মো. ইউনুস আলী পরশের বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসের বটতলার দোকানে বাকি খাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বাকি পরিশোধের দাবিতে ২০১৫ সালের ২২ মার্চ দোকান বন্ধ রাখেন বটতলার দোকানিরা। এর আগের দিন ২১ মার্চ বটতলার চায়ের দোকানি নাহিদকে মারধর করেন কমিটিতে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ পাওয়া ছিদ্দিকুর রহমান ওরফে প্রত্যয়।
আরেক সহসভাপতি হামজা রহমান অন্তর ২০১৫ সালের ৬ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বরে এক ছাত্রীর গায়ে রং ছুড়ে মারেন। এ ঘটনায় ওই ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। পরে তদন্ত করে ওই ছাত্রলীগ নেতাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিন মাসের জন্য বহিষ্কার করা হয়।
কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে আল বেরুনি (সম্প্রসারিত ভবন) হল প্রশাসনের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা আদায় করতে না পারায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষেপিয়ে তুলে হল অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গত ১৮ এপ্রিল এ ঘটনা ঘটে।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহিম জুয়েলের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ৯ এপ্রিল ছিনতাইয়ের অভিযোগ ওঠে। ওই দিন দুপুর আড়াইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনের সামনে থেকে বহিরাগত এক ব্যক্তির মুঠোফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেন তিনিসহ আরো কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মী।
কমিটিতে স্থান পাওয়া সাংগঠনিক সম্পাদক শামীম মোল্লার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধরের অভিযোগ রয়েছে। গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর ক্যাম্পাসসংলগ্ন ইসলামনগর বাজারে নৃবিজ্ঞান বিভাগের ৪৩তম ব্যাচের ছাত্র মো. শিমুল ইসলামকে মারধর করেন তিনি। এর আগে ২৯ আগস্ট নিজ সংগঠনের কর্মী শামসুল আলমকে মারধরের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। পুলিশের কাছ থেকে নারী অপহরণের আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। গত বছরের ৮ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
নতুন কমিটির সহসভাপতি আবু সাদাত সায়েম ও সহসম্পাদক মো. জামশেদ আলমের বিরুদ্ধে রয়েছে যৌন নিপীড়ন ও শিক্ষক লাঞ্ছনার অভিযোগ। এ ঘটনায় গত বছর ২৭ জানুয়ারি তাঁদের দুজনকেই শাখা ছাত্রলীগ থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়।
২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গত ১৮ ডিসেম্বর পুলিশে সোপর্দ করা হয় তৎকালীন ছাত্রলীগকর্মী ও বর্তমান কমিটির উপপরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক এস এম শরীফ আহমেদকে। এই অভিযোগে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার করার কথা জানায়।
শিক্ষা শাখার এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করে জাল মুক্তিযোদ্ধা সনদের মাধ্যমে ২০১৩-২০১৪ শিক্ষাবর্ষে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে এক শিক্ষার্থীকে ভর্তি করানোর অভিযোগ ওঠে এ কমিটির কার্যকরী সদস্য পদ পাওয়া আলিফা আহমেদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ২০১৫ সালের এপ্রিলে তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ভর্তি করা শিক্ষার্থী তখন অভিযোগ করেন, এ জন্য তাঁর কাছ থেকে চার লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।
নতুন কমিটির সহসভাপতি মো. মাজেদ সীমান্ত ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সজীব কুমার সাহার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের গেরুয়া বাজারে ৩০-৪০ জন কর্মী নিয়ে গিয়ে দোকানপাট ও গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ রফিক-জব্বার হল শাখা ছাত্রলীগের এক কর্মীর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক ছাত্রের হাতাহাতির ঘটনার জের ধরে ওই দিন বেলা ১১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
গত ১৮ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ৪০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী শুভ্র কুমারকে মারধরের অভিযোগ রয়েছে এ কমিটিতে যথাক্রমে সহসভাপতি ও আইন সম্পাদকের পদ পাওয়া আসাদুজ্জামান আশিক ও কার্তিক ঘোষ নীরবের বিরুদ্ধে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. জুয়েল রানা এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘যাঁদের বিরুদ্ধে এসব অপরাধের অভিযোগ ছিল তাঁদের কমিটিতে রাখা হয়নি। তারপরও কয়েকজনকে সংগঠনের প্রতি তাঁদের ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা বিবেচনা করে কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে। আমরা তাঁদের সাবধান করে দিয়েছি। এটা তাঁদের শোধরানোর সুযোগ দেওয়া হলো। ভবিষ্যতে এসব অভিযোগ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ বলেন, ‘অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকে। কিন্তু সব অভিযোগ সব সময় সত্য হয় না। আমরা যাচাই-বাছাই করে কমিটি ঘোষণা করেছি।’
