২৩শে অক্টোবর, ২০২১ ইং | ৭ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | শনিবার | ভোর ৫:০০

নিলে ৮০ না নিলে ৫০!

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

টাংগাইল ডেক্সঃঅনিয়ম আর দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। বিশেষ করে প্যাথলজি বিভাগে এর পরিমাণ আকাশছোঁয়া। রসিদ নিলে ৮০ এবং রসিদ না নিলে ৫০ টাকা! এমনি ঘোষণা দিয়ে প্যাথলজি টেস্ট করাচ্ছেন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্যাথলজিস্ট লিপি খাতুন। হাসপাতালে কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগসাজশে তিনি এসব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না হয়ে এসব টাকা চলে যাচ্ছে প্যাথলজিস্ট লিপিসহ হাসপাতালের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীরর পকেটে। আর এ কাজ তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন বছরের পর। কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানার পরও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।
সরজমিন জানা যায়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে দীর্ঘদিন ধরে প্যাথলজিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন লিপি খাতুন। রসিদ নিলে ৮০ এবং  রসিদ না নিলে ৫০ টাকা! এমন ঘোঘণা দিয়ে প্যাথলজি টেস্ট করাচ্ছেন তিনি। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর যোগসাজশে লিপি গড়ে তুলেছেন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। যে সিন্ডিকেটের সদস্যরা অর্থের লোভে তাকে এসব অপকর্ম করার জন্য সাহস জুগিয়ে আসছে।
স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হোসনে আরা বলেন, বুধবার আমি আমার এক আত্মীয়ের ডায়াবেটিক পরীক্ষার জন্য বুধবার ভূঞাপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাই। এসময় হাসপাতালের প্যাথলজিস্ট বিভাগের সামনে লম্বা একটি লাইন দেখতে পাই। ওই সময় দায়িত্বরত প্যাথলজিস্ট লিপি খাতুন রসিদ নিলে টাকা বেশি এবং রসিদ না নিলে টাকা কম এমন কথা বলে রসিদ ছাড়াই কম টাকায় প্যাথলজিক্যাল টেস্ট করিয়ে দিচ্ছেন। বিষয়টি আমার সন্দেহ হওয়ায় লিপি খাতুনের কাছে এর কারণ জানতে চাইলে রসিদ নিলে ৮০ টাকা এবং রসিদ ছাড়া পরীক্ষা করালে ৬০ টাকা লাগবে বলে জানান। পরে আমি রসিদ ছাড়া ৫০ টাকায় ডায়াবেটিক পরীক্ষা করাই। তাৎক্ষণিক স্থানীয় এক সাংবাদিককে বিষয়টি অবগত করি। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. জাহিদুজ্জামান জুয়েলের উপস্থিতিতে সাংবাদিক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে হাসপাতালে আসা এরকম একাধিক রোগীর কাছ থেকে রসিদ ছাড়া প্যাথলজি পরীক্ষার টেস্টের টাকা গ্রহণ করার সত্যতা মেলে। ডায়াবেটিক পরীক্ষার জন্য আসা হালিমা বেগম বলেন, বুধবার সকালে হাসপাতালে ডায়াবেটিক পরীক্ষার জন্য আসি। এ সময় হাসপাতালের প্যাথলজিস্ট লিপি খাতুন জানান রসিদ ছাড়া করালে ৫০ টাকা এবং রসিদ নিয়ে করালে ৮০ টাকা। পরে তিনি রসিদ ছাড়াই ৫০ দিয়ে ডায়াবেটিক পরীক্ষা করান। জোবেদা বেগম নামের আরেকজন জানান, ডায়াবেটিক পরীক্ষার জন্য রসিদ ছাড়া আমার কাছ থেকে ৬০ টাকা নিয়েছে। একই সময়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতে সবুজ (৭) নামের আরেক রোগীর স্বজনরা বলেন, শিশুটির রক্ত ও অন্যান্য পরীক্ষার টেস্ট বাবদ ২৫০ টাকা নিলেও রসিদ দেয়া হয়নি। প্যাথলজি পরীক্ষা করতে আসা কায়সার হোসেন বলেন, রক্ত, প্রস্রাবসহ কয়েকটি পরীক্ষা করিয়েছি হাসপাতালে। পরীক্ষার টেস্ট বাবদ প্রথমে ২৭০ টাকা নিয়েছেন লিপি খাতুন। টেস্টের রিপোর্ট দেয়ার সময় আরো ২৫ টাকা দিতে হয়েছে। তবে তিনি রিপোর্টের সঙ্গে কোনো  রসিদ পাননি। এছাড়াও অভিযোগ আছে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের পরীক্ষার টেস্ট না করিয়েই রিপোর্ট প্রদান করার। এতে ভুল চিকিৎসায় রোগীরা প্রতিনিয়তই বিপদের সম্মুখীন হচ্ছেন। এমন এক ঘটনা ঘটেছে গত ৬ই মার্চ। মালেকা (৭০) নামের একজন মহিলার কোনো টেস্ট না করিয়েই রিপোর্ট প্রদান করা হয়। এতে তার অবস্থার অবনতি হলে পরে তাকে শহীদ সালাউদ্দিন সেনানিবাসের সিএমএইচে ভর্তি করানো হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা জানান, লিপি খাতুনের এসব দুর্নীতি ওপেন সিক্রেট। একাধিক প্যাথলজিস্ট না থাকার সুযোগে লিপির এমন কর্মকাণ্ডে মুখ বুজে থাকতে হচ্ছে।
এদিকে ভূঞাপুর হাসপাতালটিতে সঠিক তদারকি না থাকার অভিযোগ তুলে সাধারণ রোগীরা জানান, তাদের কাছ থেকে অনিয়মের মাধ্যমে হাসপাতালের একটি সিন্ডিকেট প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। হাসপাতালটিতে সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অনেক রোগী ও তাদের স্বজন।
অভিযোগের বিষয়ে ভূঞাপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্যাথলজিস্ট লিপি খাতুন বলেন, হাসাপাতালে আসা রোগীদের পরীক্ষা করানোর পর রিপোর্টের সঙ্গে রসিদ দিয়ে দেয়া হয়। তবে ওই রোগীদের রেজিস্টার এন্ট্রিসহ রিপোর্টের সঙ্গে রসিদ দেয়ার প্রমাণ দেখাতে পারেননি।
ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবু সামা বলেন, আবাসিক চিকিৎসক ও আপনার মাধ্যমে অনিয়মের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হলাম। তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট অবহিত করা হবে।

Share.

Comments are closed.