লাইফ

‘উপস্থাপনা’ সংক্রান্ত কিছু টিপ্স্‌

ইশা খান:

বেশ অনেক দিন আগে থেকে এ পর্যন্ত অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে উপস্থাপনা সংক্রান্ত টিপ্স্‌ বিষয়ক পোস্টের জন্য আবদার করেছেন। এই লেখাটি হয়ত তাদের জন্য কিছুটা কার্যকরী হতে পারে।

প্রথমেই বলে নিই, আমি নিজেকে কখনই ‘ভালো উপস্থাপক’ হিসেবে সম্বোধন করি না। তবে যদি আমার হোস্টিং কারোর কাছে ভালো লেগে থাকে, সেজন্য আমি কৃতজ্ঞ। তবে হ্যাঁ; ‘উপস্থাপনা’ জিনিসটা অনেক বড় চ্যালেঞ্জিং একটা বিষয়, অন্তত এই ছোট্ট জীবনের স্বল্প অভিজ্ঞতায় বেশ ভালোই টের পেয়েছি।

শুরুতেই বলি, ‘উপস্থাপক’ হতে গেলে আপনার উচ্চারণ শুদ্ধ এবং স্পষ্ট হতে হবে, সুস্পষ্টভাবে গুছিয়ে কথা বলতে পারতে হবে, কথার মধ্যে কোন প্রকার জড়তা কিংবা আমতা-আমতা টাইপ কিছু থাকা যাবে না… এগুলো নিয়ে আমি কিছুই বলবো না। কারণ, এগুলো একেবারে বেসিক জিনিস এবং এগুলো একদম মাস্ট। এই বেসিক যোগ্যতা যদি আপনার না থাকে, আপনি মঞ্চে ওঠার কথা আপাতত মাথাতে আনবেন না। প্রতিনিয়ত চর্চার মাধ্যমে এই বিষয়গুলো আগে আয়ত্তে আনতে হবে, তারপর পরবর্তী ধাপ।

এবার আসি মূল কথাতে। অনুষ্ঠানে উপস্থাপনার ক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই ফর্মালিটি মেইনটেইন করতে হবে। কিন্তু আপনাকে ফর্মাল হওয়া যাবে না। বেশি ফর্মালিটি যদি মানুষ এতই পছন্দ করত, তবে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের নাম হত ‘বিটিভির সংবাদ’। কখনই অতিরিক্ত ভদ্রতা দেখাতে যাবেন না।

উপস্থাপনার ক্ষেত্রে আমি একটা জিনিস সব সময়েই মেইনটেইন করে এসেছি। সেটা হলো ‘অডিয়েন্স পিকআপ ল্যান্ড’ এবং এজন্য অনুষ্ঠানের একদম শুরুতেই আমি পাঁচ মিনিটের মত সময় নিই। অর্থাৎ যে সময়টায় আমি প্রোগ্রামের পরিচয় দিই, সেটাকেই আমি ‘অডিয়েন্স পিকআপ ল্যান্ড’ হিসেবে ইউস করার চেষ্টা করি। একটা লিমিটেশন রেখে, অডিয়েন্সের কাছে নিজেকে ক্যাজুয়ালি প্রেজেন্ট করতে হবে যেন তারা আপনাকে নিতান্তই অনুষ্ঠানের ‘অফিসিয়াল উপস্থাপক’ হিসেবে কাউন্ট না করে। যেন, তারা আপনাকে নিজেদেরই একজন হিসেবে ধরে নিতে পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে এবং এই জিনিসটা আপনার পুরো প্রোগ্রামে কাজে লাগবে। পরবর্তীতে আপনার কথার মধ্যে জড়িয়ে গেলেও, প্রথম ঐ পাঁচ মিনিটের ‘অডিয়েন্স পিকআপ ল্যান্ড’এর কারণে আপনার উপর কোন প্রকার কমপ্লেইন আসবে না।

দ্বিতীয়ত, আপনি যখন সরাসরি অডিয়েন্সের সামনে দাঁড়িয়ে উপস্থাপনা করবেন, তখন ভুল-ত্রুটি হতেই পারে। এটা কোন ব্যাপারই না। কিন্তু ব্যাপার হলো… হুট করে কোন ভুল-ত্রুটি হয়ে গেলে, সেটাকে আপনি কীভাবে রিকাভার করে নেন। যখন কোন ভুল করে ফেলবেন, নিজেকে শতভাগ ক্যাজুয়াল রাখাটা অনেক বড় একটা আর্ট। প্রয়োজনে, আপনি ঠিক কী ভুল করলেন, একটা মজা পাওয়া টাইপ হাসি দিয়ে সেটা অডিয়েন্সের সামনে স্বীকার করে ফেলুন যেন আপনার সেই ভুলটা তাদের কাছে ছোটখাটো একটা স্ট্যান্ড-আপ কমিডির মত হয় আর তারা যেন সেটাতে বিনোদন পেয়ে হেসে ফেলতে পারে।

অনেক সময় প্রোগ্রামের মাঝেই কিছু জায়গায় সিডিউলিং-এর ব্যপক ঝামেলা তৈরী হতে পারে। সেগ্মেন্ট মিসপ্লেসড হতে পারে। এমন আরও জটিল কিছু অনাকাঙ্খিত সমস্যাও আসতে পারে। কিন্তু খুবই খোলা মনে আপনাকে সেগুলো ট্যাকেল দেয়ার মত আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। যখন কনফিডেন্স নিয়ে আপনি মঞ্চে থাকবেন, তখন যে কোন সমস্যা আসলেও খুব দ্রুতই তার সমাধান আপনার মাথায় চলে আসবে।

লাইভ অনুষ্ঠানে একটা সেগ্মেন্ট থেকে আরেকটা সেগ্মেন্ট-এর মাঝে হুটহাট কোন গ্যাপ টাইম তৈরী হয়ে যেতেই পারে। কিন্তু সেই গ্যাপ টাইম হতে হবে আপনার জন্য মোক্ষম অস্ত্র। আপনি মঞ্চে কীভাবে কথা বলবেন, তার স্ক্রিপ্ট তৈরী করাটা একদমই জরুরি না। কিন্তু নিজের স্টকেজে এমন কিছু জিনিস আগে থেকেই প্রস্তুত রাখতে হবে যেন সেই গ্যাপ টাইমগুলোতে আপনি আপনার স্টকেজে থাকা জিনিসগুলো দিয়ে টাইমটা পার করতে পারেন। এবং অবশ্যই সেগুলো উপভোগ্য হতে হবে। একদম হুট করে মাথায় কিছু না আসলে, সর্বোত্তম উপায় হলো… আয়োজক অর্গানাইজেশনকে হাইলাইট করে দিন। আয়োজকদের পূর্ণাঙ্গ পরিচিতি দেয়া চেষ্টা করেন। তাতে সময়টা ইনফরমেটিভও হবে, অর্গানাইজারের প্রোমোশোনও হবে আবার টাইমটাও পাস হয়ে যাবে।

একেকটা সেগ্মেন্টের পর যখন আপনি মাইক্রোফোন পাবেন, সেই সেগ্মেন্টের উপর খুবই সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করুন। মন্তব্যগুলো যেন অবশ্যই বাস্তব সম্মত হয় যেন সেগুলো অডিয়েন্সেরই মনের কথা হয়ে থাকে। সর্বদাই চেষ্টা করবেন হাস্যরসাত্মক থাকার। পুরো প্রোগ্রাম জুড়েই অডিয়েন্স পার্টিসিপেশন নিশ্চিত করার চেষ্টা করুন; সেটা যে কোন পথেই হোক।

একজন মানুষকে অথোরিটি থেকে দাওয়াত দেয়া হলো তাদের প্রোগ্রামে আসার জন্য। সেই মানুষটা অনুষ্ঠানে আসলেন, চেয়ারে বসলেন। এরপর মঞ্চে যথারীতি অনুষ্ঠানসূচি অনুযায়ী একের পর এক সেগ্মেন্ট হতে লাগলো। যখন ভালো কিছু হলো, সেই মানুষটা হাত তালি দিলেন মন থেকে। যখন খুব একটা ভালো লাগলো না, তখনও সবাই হাত তালি দিচ্ছেন বলে তিনিও আলসেমি করেও হাত তালি দিলেন… বিষয়টা যদি নিতান্তই এমন হয়, তবে আপনার প্রোগ্রামের তেমন কোন ভ্যালু তার কাছে থাকবে না। আর উপস্থাপক হিসেবে আপনিও এগোতে পারবেন না।

সেজন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে চেষ্টা করুন… ঐ চেয়ারে বসে থাকা মানুষগুলোকে প্রোগ্রামের মধ্যে ইনভল্ভ্‌ করার। যে স্থানে একজন মানুষের কোন প্রকার অংশগ্রহন থাকে না, সেখানে সে আগ্রহীও হয় না। ফলশ্রুতিতে সে কিছুক্ষণ পর সুযোগ পেলেই দৌড় দিবে। তাই, সর্বদা অডিয়েন্সের সাথে আই কনট্যাক্ট মেইনটেইন করতে হবে এবং এই আই কনট্যাক্ট মানে কিন্তু তাদের চোখে চোখ রেখে ফুলের বাগানে হারিয়ে যাওয়া নয়… এই আই কনট্যাক্ট মানে হলো, তাদের চোখের দিকে তাকিয়েই বুঝে ফেলা ঠিক ঐ সিচুয়েশনে তারা প্রোগ্রামটা নিয়ে কী ভাবছে। যদি তারা বোরিং হয়ে যায়, তবে তাদের উজ্জীবিত করার জন্য শর্ট কোন ওয়ে আপনাকে ব্যবহার করতে হবে; তাদের পার্টিসিপেশন নিশ্চিত করতেই হবে। একটা প্রোগ্রামে আপনি যতটা অডিয়েন্স পার্টিসিপেশন নিশ্চিত করবেন, আপনার প্রোগ্রাম তত হিট হবে। প্রোগ্রামের নাম তত ছড়িয়ে পড়বে। যে অর্গানাইজাররা প্রোগ্রাম থ্রো করেছেন, তাদের পরবর্তী প্রোগ্রামেও সেই মানুষগুলো আসার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে থাকবে

মূল বিষয় হলো এই… অডিয়েন্সকে আপনার দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করুন। যেন, কোন একটা লোয়ার গ্রেড সেগ্মেন্টের পরেও অডিয়েন্স শুধু আপনার কথা শুনবে বলেই বসেই থাকে। এটা অনেক ইম্পর্টেন্ট। এর জন্য মাঝে মাঝে হালকা কিছু পার্সোনাল কথাও তাদের সাথে শেয়ার করেন যেন তারা আপনাকে ব্যক্তি মানসিকতায় জড়িয়ে নেয়ার সুযোগ পায়। এটাও একটা ট্রিক্স। উপস্থাপক হিসেবে যখন আপনি স্টেজে উঠবেন, তখন… আপনি গায়ক না হলেও, আপনাকে গাইতে জানতে হবে; আপনি জোকার না হলেও, আপনাকে কৌতুক করতে পারতে হবে; আপনি আবৃত্তিকার না হলেও, আপনাকে আবৃত্তি করতে পারতে হবে; আপনি মজার মানুষ না হলেও, আপনাকে সর্বদাই একটু কৌতুকপ্রদ থাকতেই হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা… আপনাকে ‘স্বতঃস্ফূর্ত এবং কনফিডেন্ট’ হতে হবে।

আমি আবারও বলছি… আমি দক্ষ কোন উপস্থাপক নই; শুধুমাত্র ভালো কিছু করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমি নিজেও এখনো শিখছি। তবে এই উপায়গুলো মেনে আমি নিজেও বেশ উপকৃত হয়েছি বলেই যারা ‘উপস্থাপনা’ বিষয়ে আগ্রহী… তাদের উদ্দেশ্যে উন্মুক্ত করলাম! <3

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *