এক্সক্লুসিভ স্বাস্থ্য

লাইসেন্স ছাড়াই চলছে বার!

জসীম উদ্দীন , আদনান রহমান :

একটি নির্দিষ্ট স্থানে অ্যালকোহল বা মদ পানের জন্য প্রয়োজন লাইসেন্স। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সুপারিশে এ লাইসেন্স দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত চার বছর ধরে বন্ধ রয়েছে লাইসেন্স প্রদান কার্যক্রম। তবে অধিদফতর আর মন্ত্রণালয়কে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে শুধুমাত্র লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে দেশে অর্ধশতাধিক রেস্টুরেন্ট, ক্লাব আর হোটেলগুলোতে চলছে জমজমাট অবৈধ বারের ব্যবসা।

রাজধানীর ডজনখানেক হোটেল-ক্লাবে সরেজমিন পরিদর্শন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকে এমন তথ্য জানা গেছে।

সম্প্রতি রাজধানীর ধানমন্ডি ক্লাবে গিয়ে দেখা যায়, অনুমোদন ছাড়া সেখানে অ্যালকোহল পানের উৎসব চলছে। ক্লাবের সদস্যরা প্রভাবশালী হওয়ায় অসহায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও পুলিশ। চার বছর আগে ক্লাবটি আবেদন করেছিল লাইসেন্সের জন্য। ওই আবেদনই শেষ। অনুমোদন ছাড়া বার পরিচালনা করছে ক্লাবটি। অর্ধশতাধিক সদস্যকে মদের আড্ডায় মত্ত দেখা যায় সেখানে।

এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে বারের একাধিক সদস্য জানান, তারা এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য স্বীকৃত নন। তথ্য নেয়ার জন্য কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে- জানতে চাইলে ক্লাবের একজন বলেন, ‘কথা বলার মতো তো কেউ নেই।’

চলতি বছরের ৩০ মার্চ অভিযান চালিয়ে ধানমন্ডি ক্লাব থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৯২ কেস বিয়ার ও ৩৬ কেস বিদেশি মদসহ তিনজনকে আটক করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি)। তাদের জরিমানা করা হয় ৪০ লাখ টাকা। এরপরও বন্ধ হয়নি ক্লাবটির বার পরিচালনা।

অবৈধভাবে বার পরিচালনা ও মাদকদ্রব্য বিক্রির অভিযোগে অভিযান চালিয়ে জাপান বাংলাদেশ ক্লাবকে জরিমানা করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর।

রাজধানীর ‘বনানী ক্লাবে’ দেদারছে চলে মদ বিক্রি ও পানের আয়োজন। বিষয়টি সবারই জানা। কিন্তু এরপরও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট দফতরের।

একই চিত্র রাজধানীর গুলশান-২ নম্বরের দি-ক্যাপিটাল রিক্রেশন ক্লাবের। বার পরিচালনার আবেদন করেই যেন দায় শেষ। এরপর সম্পূর্ণ অবৈধভাবে মদ বিক্রি হচ্ছে সেখানে। ২০১৪ সালে র্যাব-১ এর সদস্যরা অভিযান চালিয়ে ক্লাবটি থেকে কোটি টাকার মদ-বিয়ার জব্দ করে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে পুলিশ বাদী হয়ে মামলাও দেয়।

রপর কিছুদিন বন্ধ থাকে ক্লাবটি। ফের সেখানে প্রকাশ্যে মদ-বিয়ার বিক্রি শুরু হয়। একইভাবে গুলশানের অন্তত অর্ধশতাধিক হোটেল-ক্লাবে চলছে অবৈধ এ ব্যবসা।

এ প্রসঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরে মহাপরিচালক (ডিজি) মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, এমন অভিযোগ আমাদের কাছে নেই। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা কার্যকর ব্যবস্থা নেই।

ধানমন্ডি ক্লাবে ফের বার পরিচালনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট বক্তব্যের ভিত্তিতে আমরা ধানমন্ডি ক্লাবে অভিযান চালিয়ে মাদকদ্রব্য জব্দের পর ৪০ লাখ টাকা জরিমানা করি। এ ধরণের অভিযোগের সত্যতা পেলে ধানমন্ডি ক্লাবসহ অন্য ক্লাব ও হোটেলে ফের অভিযান চালানো হবে।

উত্তরা, গুলশান ও বারিধারা এলাকা র্যাব-১ এর অধীন। জানতে চাইলে র্যাব-১ এর অধিনায়ক (সিও) লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাসেম জাগো নিউজকে বলেন, সরকার-কর্তৃক নিষিদ্ধ সবকিছুর বিরুদ্ধেই আমাদের অভিযান পরিচালিত হয়। উত্তরা কিংবা গুলশান এলাকায় অনুমোদন ছাড়া বার পরিচালনা কিংবা মাদক বিক্রির অভিযোগ পেলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেই এবং ভবিষ্যতেও নেবো।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রমনার বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মারুফ হোসেন সরদার জাগো নিউজকে বলেন, ধানমন্ডি এলাকায় অননুমোদিত কোনো ক্লাব-হোটেলে যদি বার পরিচালিত হয় অথবা অ্যালকোহল বিক্রি হয়- এমন অভিযোগ যদি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর অথবা কোনো ব্যক্তি আমাদের জানায়, আমরা অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেবো।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে জানান, এ ধরনের অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো হোটলে কিংবা ক্লাবে অভিযান পরিচালিত হলে তা দ্রুতই অন্য হোটেল বা ক্লাবে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে অন্য বার বা ক্লাবে অভিযান চালানোর আগেই তা বন্ধ করে দেয়া হয়। যে কারণে একই সময়ে একটির বেশি প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা সম্ভব হয় না। এছাড়া একই সঙ্গে একাধিক প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানোর মতো জনবলও আমাদের নেই।

তিনি আরো বলেন, বার পরিচালনা ও মদ বিক্রির অভিযোগের ভিত্তিতে অনেক হোটেলে নিয়মিতই অভিযান চালাই। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বিদেশিরা মদের বোতল নিয়ে বসে আছেন। তারাই মদের বোতল সঙ্গে আনেন। তারা সেখানে বসে পান করেন। ব্যাগেজ রুলস অনুযায়ী এজন বিদেশী নাগরিক সর্বোচ্চ সাত লিটার পর্যন্ত মাদকদ্রব্য বহন করতে পারেন। সেই সুবিধা নিয়েই তারা বারে বসে মদ পান করেন। সেক্ষেত্রে আমাদের করার কিছু থাকে না।

অবৈধভাবে অনুমোদন ছাড়াই ক্লাব ও হোটেলে বার পরিচালনা এবং মাদক বিক্রি সম্পর্কে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মো. মেহেদী হাসান জাগো নিউজকে বলেন, বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালিত হয়। তবে জনবল সংকটের কারণে অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিযান চালানো সম্ভব হয় না।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ বার পরিচালনার অনুমোদন দেয়া হয় হোটেল-৭১, ফার্স হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস, হোটেল সুইট ড্রিম ও হোটেল আমারি। ১১টি ক্লাব ও তিনটি হোটেলের আবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন। ক্লাবগুলোর মধ্যে বনানী ক্লাব, বারিধারা কসমোপলিটন ক্লাব, ধানমন্ডি ক্লাব, ঢাকা রয়্যাল ক্লাব, দ্য কিউব ক্লাব বারিধারা, দ্য ক্যাপিটাল রিক্রেশন ক্লাব উল্লেখ্যযোগ্য। এছাড়া অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা তিনটি হোটেলের মধ্যে বগুড়ার পাঁচ তারকা মম ইন, পাবনার রত্না হোটেল ও উত্তরার একটি হোটেল। তবে কয়েক বছর ধরে রেস্টুরেন্টে বারের অনুমোদন দেয়া বন্ধ রেখেছে অধিদফতর।

এ বিষয়ে মো. মেহেদী হাসান বলেন, সাধারণত একটি বারের লাইসেন্স নেয়ার জন্য নির্ধারিত একটি ফরম পূরণ করতে হয়। জমির বৈধ কাগজপত্র, মালিক ও মালিকানার নাম, মালিকদের পরিচয়পত্র, জমির নকশা, স্থানীয় সংসদ সদস্যের অনাপত্তিপত্র, পুলিশ ভেরিফিকেশন, ক্লাবের ট্রেড লাইসেন্স ও ক্লাবের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ২০০ সদস্য থাকা।

অনুমোদন দেয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় সংসদ সদস্যের অনাপত্তিপত্রকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়। আবেদনের ফি ৫০ হাজার টাকা। তিন ক্যাটাগরিতে বার পরিচালনার জন্য অনুমোদন দেয়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে রেস্টুরেন্টগুলোতে বার পরিচালনার অনুমোদন দেয়া হচ্ছে না। বার পরিচালনার অনুমোদনের বিষয়টি সরকারের উচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কাজ।

CR-Jagonews24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *