কলাম জেলার খবর

কুষ্টিয়ায় ‘জুয়ার আসর’ বন্ধ এবং কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন

ওয়াহেদ সবুজ:

আমাদের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু কিছু ক্রিয়াকলাপ অত্যন্ত হাস্যকর ও কৌতূহলোদ্দীপক! মানে, আমার মাথায় ঢোকে না আর কি!
নিউজে পড়লাম, পুলিশের সহায়তায় জেলা প্রশাসন কুষ্টিয়ায় চলমান ‘শিল্প ও বাণিজ্য মেলা’ থেকে ‘জুয়ার আসর’ উৎখাত করেছে৷ ভালো কথা! তো, এ জুয়ার ধরনটা কেমন ছিল? ধরনটা এ রকম ছিলো— লটারির টিকিট (কুপন) ছাড়া হতো; লোকে সে টিকিট স্বেচ্ছায় কিনতো প্রতিটি বিশ টাকা দরে; রাত দশটায় লোকসম্মুখে সে টিকিটের খেলা অনুষ্ঠিত হতো যা টেলিভিশনের পর্দায় সরাসরি সম্প্রচার করা হতো; সর্বোচ্চ নির্ভুলতা ও সঠিকতা বজায় রেখে খেলাটা চালানো হতো; যারা পুরস্কার পেত, সর্বসম্মুখে তাদের হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া হতো৷ আমাদের প্রশাসনের কাছে এটাকে ‘আনফেয়ার’ বলে মনে হয়েছে৷ খুব ভালো কথা! কিন্তু এখানে আমার কয়েকটি প্রশ্ন আছে৷ তার আগে বলে নিতে চাই যে, যে কোনো ধরনের জুয়া বা লটারির বিপক্ষে আমার অবস্থান; বিনাশ্রমে শর্টকাটে ধনসম্পদ অর্জনের পক্ষে আমি নই৷ এবার চলুন সকলে মিলে কিছু প্রশ্নের সামনে দাঁড়াই—

* যদি লটারি খেলাটা ‘জুয়া’ হয় এবং সে যুক্তিতে এটা নিষিদ্ধ করাটা উচিত হয়, তাহলে দুদিন পরপর সারা দেশ জুড়ে যে ‘১ম পুরস্কার ২৫ লক্ষ টাকা অথবা একটি ফ্ল্যাটসহ সর্বমোট ১০০১টি পুরস্কার’ টাইপের লটারিগুলো কেন জুয়া বলে বিবেচিত হবে না?
* সেগুলো যদি জুয়া বলে বিবেচিত হয়, তাহলে সেগুলো কেন নিষিদ্ধ করা হয় না? তাদের ধরে এনে কেন বিচারের মুখোমুখি করা হয় না? না-কি তখন জেলা প্রশাসনের চোখ কালো কাপড়ে বাঁধা থাকে এবং কানে তালা লাগানো থাকে?
* যদি এটা ‘জুয়া’ই হয়ে থাকে, যদি এটা ‘অবৈধ’ই হয়ে থাকে, তাহলে জেলা প্রশাসনের অনুমতিসাপেক্ষে আয়োজিত একটি মেলায় এ ধরনের একটি জুয়াখেলা আয়োজন করার সুযোগ কীভাবে হয়?
* আয়োজন যদি-বা কোনোভাবে হয়েই গেল, তো এত দিন ধরে খেলাটা চলতে পারলো কীভাবে? বৃহত্তর কুষ্টিয়াজুড়ে সর্বমোট ১৫০টি রিকশা-অটোরিকশাতে করে মাইকিং এর মাধ্যমে লোক ভিড়িয়ে প্রকাশ্যে দৈনিক হাজার হাজার টিকিট বিক্রি হতে পারলো কীভাবে?
* এত দিনের এত এত প্রচার-প্রচারণা-মাইকিং এমনকি টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার— সবকিছুই প্রশাসনের অজানা থেকে গেল কীভাবে?
* এত দিন ধরে প্রকাশ্যে এমন একটি ‘অবৈধ জুয়া খেলা’ চলতে পারলো, অথচ সেটা প্রশাসন জানতে পারলো দশ-বারো দিন পরে এসে, তাহলে এ প্রশাসন শহরের সমস্যার দেখভাল কীভাবে করবে?
* যদি জেনেশুনেই তারা এত দিন চুপ থেকে থাকে, তাহলে হঠাৎ তাদের কাছে এটি ‘জুয়া’ কেন মনে হলো? অন্য কোনো হিসাব-নিকাশ থাকার সম্ভাবনা কি আছে?
* এ ‘অবৈধ জুয়া ব্যবসা’টি যদি প্রশাসনের অনুমতি ব্যতীতই হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে প্রশাসনের অনবগতিতে যদি এভাবেই দিনের পর দিন একটি অন্যায় প্রকাশ্যে নির্বিঘ্নে ঘটে যেতে পারে, তাহলে এ শহর কি প্রকৃতপক্ষেই ‘নিরাপদ’ রয়েছে?
* একটি লটারি খেলা যেটা প্রকাশ্যে স্বার্থসংশ্লিষ্ট সকলের সম্মুখে, যারা টিকিট কিনেছে তাদের প্রত্যেকের চোখের সামনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সেটাকে যদি ‘আনফেয়ার’ বলতে হয়, তাহলে লোকচক্ষুর অন্তরালে হওয়া নানাবিধ ‘লেনদেন’গুলোকে আমরা কোন যুক্তিতে ‘আনফেয়ার’ ঘোষণা করতে পারবো না? ‘আনফেয়ার’ যুক্তিতে সেসব ইতিহাসকেও কেন হিসাবের আওতায় আনা হবে না? যদি পরিপূর্ণরূপে ‘ফেয়ার’ একটি খেলাকে অন্যায় বিবেচনা করতে হয়, তাহলে গোপনে হওয়া ‘আনফেয়ার’গুলোকে ন্যায় বিবেচনা করতে হবে কি না?

* বলা হচ্ছে, ‘জনগণের অভিযোগ ও সমালোচনা’র প্রেক্ষিতে প্রশাসন কাজটি করেছে! অথচ আমি একটা মানুষের কাছেও এ বিষয়ে কোনো অসন্তোষের কথা শুনিনি৷ আমি চ্যালেঞ্জ করতে পারি, এ লটারির ব্যাপারে শহরের অন্তত ৯৯% মানুষের কোনো অভিযোগ-অসন্তোষ নেই৷ কুষ্টিয়া অঞ্চলের টিআরপি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এ অনুষ্ঠানটি নিঃসন্দেহে স্টার জলসার সিরিয়ালগুলোকে ব্যাপক ব্যবধানে পেছনে ফেলে দিয়েছে! আর যদি তর্কের খাতিরে মেনেও নিই যে এ বিষয়ে জনগণের অভিযোগ ছিল, তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়— একটা ব্যাপার ‘আইনের লঙ্ঘন’ বা ‘অপরাধ’ জানা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে একশান নেয়ার জন্য ‘জনগণের অভিযোগ ও সমালোচনা’ আবশ্যকভাবে প্রয়োজনীয় হবে? কেউ অভিযোগ না তুললে একটা অন্যায়কে ‘ন্যায়’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হবে?
প্রশাসন উত্তর দেবে কি না জানি না, সেটা নিয়ে আমি বিচলিতও নই! আমি কেবল ঢালাওভাবে একটা ঘটনাকে একপেশে মূল্যায়নের পূর্বে আপনাদের মনে প্রশ্নগুলো তৈরি করে দিতে চাইলাম! উত্তর খোঁজার অনুরোধ রইলো! এট লিস্ট প্রশ্ন তোলার প্রয়োজনটুকু অনুভব করবেন— এ প্রত্যাশা রইলো!
ধন্যবাদ!