এক্সক্লুসিভ কলাম

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এবং একটি গিরগিটির আত্মহত্যা 

ওয়াহেদ সবুজ:

সম্প্রতি শোনা যাচ্ছে, সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতির পরীক্ষার সিস্টেমে আরো এক দফা পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে! এবার চিন্তা করা হচ্ছে, বহুনির্বাচনি প্রশ্ন সম্পূর্ণ উঠিয়ে দিয়ে দশ সেট সৃজনশীল প্রশ্নের লিখিত পরীক্ষা নেয়া হবে৷

আমি চিরদিনই একটা কথা বলি— শিক্ষাক্ষেত্র এমন একটা জায়গা যেখানে হুটহাট হঠকারি সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়; এখানে পরিকল্পনা হতে হবে গবেষণালব্ধ এবং দীর্ঘমেয়াদি৷ বেশ কিছুকাল আগে, যখন বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ১০টি কমিয়ে এনে সৃজনশীল প্রশ্ন সাতটির উত্তর বাধ্যতামূলক করা হলো, তখন একটা লেখা লিখেছিলাম৷ সেখানে বলেছিলাম— আমি মনে করি, সৃজনশীল প্রশ্ন আটটিতে উন্নীত করে বহুনির্বাচনি আরো কমিয়ে বিশটিতে নিয়ে আসা উচিত৷ কারণ বহুনির্বাচনি প্রশ্নোত্তরের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর মেধা যাচাইয়ের সুযোগ খুব কমই থাকে; অনেক সময় না জেনে আন্দাজে উত্তর করলেও সঠিক হয়ে যাবার সুযোগ থাকে৷ আমি জানি না, অতি সাধারণ ব্যাপারগুলো আমাদের নীতিনির্ধারকদের মাথায় এত দেরিতে কেন আসে!
এবার আসি আলোচিত নতুন সিস্টেমের গুণগত দিক নিয়ে৷ প্রথমত, আমি মনে করি, দশ নম্বরের হলেও বহুনির্বাচনি প্রশ্ন থাকা উচিত; এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীর স্মৃতিশক্তি যাচাই এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্র তৈরি হয়৷ তবে, আমি সব সময়ই লিখিত পরীক্ষার পক্ষে৷ দ্বিতীয়ত, কেবল স্কুল-কলেজ পর্যায়ে নয়, আমি বিশ্বাস করি, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষার উপযোগিতা আরো বেশি৷ লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে পরীক্ষা নিলে নিশ্চিতভাবেই অপেক্ষাকৃত যোগ্যরাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাবে— এতে সন্দেহের কোনোই অবকাশ নেই! তাই এটা অত্যন্ত জরুরি৷

কিন্তু ঝামেলাটা অন্য জায়গায়৷ শোনা যাচ্ছে— পুরো একশো নম্বরই যে লিখিত নেয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, এর পেছনের উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা! কি সেলুকাস! এসব দেখেশুনে আপনাদের একটি প্রশ্ন করতে মন চাচ্ছে৷
মনে করুন, কোথাও একটা সেতু তৈরির কাজ চলছে৷ অসংখ্য শ্রমিক সেখানে শ্রম দিচ্ছে৷ তো, একদল গবেষক মনস্তাত্ত্বিক একটি গবেষণার জন্য সেখানে গেলেন; ধরে নিন, আপনিও সেই গবেষণা দলের একজন সদস্য৷ সেখানে কর্মরত প্রত্যেকটি শ্রমিককে একটি প্রশ্ন করা হলো— ‘আপনি এ কাজ কেন করছেন?’ খুব স্বাভাবিকভাবেই সকলে প্রায় একই রকম উত্তর করলো— ‘টাকার জন্য করছি; সংসারের খরচ চালানোর জন্য, জীবিকা নির্বাহের জন্য করছি৷’ কেবল একজন ভিন্ন উত্তর করলো; সে বললো, ‘এই যে এই সেতুটা তৈরি হলে কত কত মানুষের উপকার হবে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিতে এই সেতু ভূমিকা রাখবে৷ দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণের কথা ভেবে কাজটি করছি৷’
আপনার কী মনে হয়, দেশের জন্য কোন চিন্তার মানুষ অধিক কার্যকরি? নিশ্চিতভাবেই আমরা উপর্যুক্ত দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষকেই গ্রহণ করবো৷ কেন করবো? কারণ— যদিও চিন্তার জায়গাটা যেমনই হোক, প্রত্যেক শ্রমিকই সেখান থেকে একই পরিমাণ অর্থ আয় করবে এবং সে অর্থ তারা একই কাজে (জীবিকা নির্বাহ) ব্যয় করবে, তথাপি যে মানুষটি পরিশীলিত চিন্তার অধিকারী, যে কেবল তার ব্যক্তিগত প্রয়োজন নয়, বরং বৃহত্তর অর্থে রাষ্ট্রের কল্যাণচেতনা ধারণ করে, যার কাজের পেছনে দেশ ও দেশের মানুষের মঙ্গলকামনার উদ্দেশ্য থাকে, তার দ্বারাই রাষ্ট্র উপকৃত হবে৷
আসল কথায় আসি৷ এই যে দশটি সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর করার সিস্টেম চালু হবে, এটাকে আমি সাধুবাদ জানাতেই পারি, কিন্তু যখন কারণ হিসেবে দেখছি প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধের বিকল্প হিসেবে এটি আসছে, তখনই বুকের মধ্যে দুরুদুরু আশঙ্কা এসে ভর করছে৷ যদিও কারণ যেটাই হোক, সিস্টেমটা কার্যকর বটে, তথাপি উদ্দেশ্যটি ‘সাদা’ হওয়া বাঞ্ছনীয়৷ যখনই বলা হচ্ছে, প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করতে এ সিদ্ধান্ত, তখনই প্রশ্ন এসে যাচ্ছে— তাহলে কি এ ফাঁসকারী চক্রটি এতটাই শক্তিশালী যে তাদের আটকাতে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যর্থ? আমাদের এত বড় সিস্টেম, আমাদের রাষ্ট্রের এত এত নজরদারী— সবকিছু পরাজিত হয়ে গেল? এত ভঙ্গুর একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে দেশ চলছে?
দুঃখজনক! অত্যন্ত দুঃখজনক!

একটি রাষ্ট্রের শিক্ষাক্ষেত্রে যখন পঞ্চম শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষা থেকে শুরু করে বিসিএস পরীক্ষা পর্যন্ত সকল ধরনের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায়, তখন সে রাষ্ট্র নগ্নতার ইতিহাস হয়ে দেখা দেয়৷ এতটা নোংরা, এতটা অপরিচ্ছন্ন, এতটা বিশ্রী অবস্থা একটি রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থায় হতে পারে— এটা পৃথবীর ইতিহাসে বিরল বৈ কি!

এবারে একটু ভিন্ন দিকে নজর দেয়া যাক, চলুন৷ আমি জানি, এখন যে কথাগুলো বলবো, তাতে করে অনেকেই আমার ওপর নাখোশ হতে পারেন; কিন্তু তাতে সত্য বদলে যাবে না৷ যদি আপনাকে প্রশ্ন করা হয়— ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের সবচাইতে সফল মন্ত্রী কে?’ আপনি কি বিএনপি আমলের এহছানুল হক মিলন বাদে অন্য কারো নাম মনে করতে পারবেন? আমি নিশ্চিত জানি, নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে এটিই সর্বাপেক্ষা উত্তম উত্তর৷ আওয়ামী শাসনামলে দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে যে ভয়ানক ‘আইয়্যামে জাহেলিয়া’ শুরু হয়েছিল, নকল নামক যে বিষ দেশের শিক্ষার প্রাণশক্তি সব শুষে নিচ্ছিল, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা স্বয়ং যখন উপহাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল, ঠিক সে সময়ে অনেকটা দেবদূতের মতো করে হাজির হয়েছিলেন তৎপরবর্তী শিক্ষা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মিলন সাহেব৷ এ যেন এক উজ্জ্বলতম সফলতম উপাখ্যান৷ তিনি এলেন, দেখলেন, এবং জয় করলেন৷ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার চেহারা পরিবর্তন করে দিলেন৷ নকলকে ‘জাদুঘরে’ পাঠিয়ে দিলেন বলা চলে এক হাতে৷ ক্ষমতার পালাবদল হলো; আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায়! শিক্ষাব্যবস্থায় কাঁটাছেঁড়া শুরু হলো; সে কাঁটাছেঁড়াকে সকলেই স্বাগত জানিয়েছিলাম আমরা৷ কিন্তু, একটি সিস্টেম দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই নতুন সিস্টেম; পুরোনো সিস্টেমের সংযোজন-পরিমার্জন-বিয়োজন এমনভাবে চলতে লাগলো যেন মনে হলো কোনো একটা শিশুর হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়া হয়েছে; সে যখন যে খেলনা (সিস্টেম) পছন্দ হচ্ছে, সেটা নিয়ে খেলছে; সকালে যেটা নিয়ে খেলছে, বিকেলে সেটা তার কাছে পুরোনো হয়ে যাচ্ছে৷ বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর আমলেই আমরা এক বছরে পাঁচবার পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষাপদ্ধতির পরিবর্তন হতে দেখেছি৷ রাগ করেন আর যাই করেন, বলতে দ্বিধা নেই— অন্য অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকারের সফলতা যতটা, সে সকল সফলতা দিয়েও এই এক শিক্ষাক্ষেত্রে তার যে ব্যর্থতা, সেটাকে ঢাকা যাবে না কোনোভাবেই!
এত এত কিছুর পরেও একজন নিপাট ভদ্রলোক গোবেচারা মানুষকে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে থেকে আরো অসংখ্য ব্যর্থতার ইতিহাস রচনার সুযোগ আমরা কেন দিচ্ছি— জানি না৷

যাই হোক, সবশেষে একটি বহুল প্রচলিত স্যাটায়ারের পরিমার্জিত সংস্করণ:
একটি গিরগিটি আত্মহত্যা করে মারা গেছে৷ মৃত্যুর প্রাক্কালে সে একটি সুইসাইড নোট লিখে গেছে; সেখানে লেখা— ‘বাংলাদেশের শিক্ষাপদ্ধতির মতো এত ঘন ঘন এতবার করে রং পাল্টাতে পারি না বলে….’!