আন্তর্জাতিক জাতীয়

মুখের প্রস্তাব না মনের প্রস্তাব মিয়ানমারের?

আয়না নিউজ ডেস্ক:

মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আশ্বস্ত করলেও বন্ধ হয়নি রাখাইনে সহিংসতা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, এখনো ১০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায়। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, প্রতিরাতেই বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা ঢুকছে।

রাখাইন থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা আগের তুলনায় কিছুটা কমে এলেও বন্ধ হয়নি। প্রতিদিন এখনো গড়ে এক-দেড় হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। গত এক সপ্তাহে সাত হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে, যারা আসছেন, তারা বলছেন, এখনো নির্যাতন চলছে। বাড়ি-ঘরে আগুন দেয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের চলে যাওয়ার জন্য রাখাইনে মাইকিং করা হচ্ছে।

কক্সবাজারের সাংবাদিক আব্দুল আজিজ গণমাধ্যমকে জানান, ‘গত তিনদিন আমরা সীমান্তের এপার থেকে ওপারের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে আগুন জ্বলতে দেখেছি। এমনকি আজ মঙ্গলবারও আগুন জ্বলতে দেখা গেছে।’

তিনি বলেন, ‘এখন রোহিঙ্গারা শাহপরী দ্বীপসহ আরো কিছু সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করছেন। কৌশল হিসেবে তারা রাতের বেলায় প্রবেশ করেন। আজ মঙ্গলবারও কমপক্ষে এক হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রবেশ করেছেন। যারা আসছেন তারা বলছেন যে, রাখাইনে নির্যাতন এখনো চলছে। বাড়ি-ঘরে আগুন দেয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের রাখাইন ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য মাইকিং অব্যাহত আছে।’

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে মন্ত্রী পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব
অথচ মিয়ানমারের ক্ষমতাধর নেত্রী অং সান সু চি’র দপ্তরের মন্ত্রী বাংলাদেশে একদিনের সফরে এসে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি কী জানেন না যে, রাখাইনে এখনো রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে? নাকি আন্তর্জাতিক চাপে আইওয়াশ?

সোমবার ঢাকায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে মন্ত্রী পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার প্রস্তাব দেন মিয়ানমারের সু চি’র দপ্তরের মন্ত্রী কিউ টিন্ট সোয়ে। তবে মিয়ানমার বলছে, তারা ২৫ অাগস্ট থেকে বাংলাদেশে যারা এসেছে তাদের যাচাই-বাছাই করে ফেরত নেবে। কিন্তু এর আগে আরো যে চার লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে, তাদের ব্যাপারে মিয়ানমার নীরব।

সূত্র বলছে, যাচাই-বাছাইও মিয়ানমার এককভাবে করতে চায়। কিন্তু বাংলাদেশ চায় তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতে মিয়ানমার- বাংলাদেশ যৌথভাবে তা করুক। মিয়ানমার যদি তাদের দেয়া নাগরিকত্বের কার্ড শুধু বিবেচনা করে, তাহলে সেরকম রোহিঙ্গার সংখ্যা সাত হাজারের বেশি হবে না। একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তার রূপরেখা এখনো চূড়ান্ত নয়। বাংলাদেশ চায় রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়া হোক, রাখাইনে সহিংসতা বন্ধ হোক এবং কোফি আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়িত হোক।

সহিংসতা অব্যাহত রাখা ছাড়াও মিয়ানমার এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, তাদের আইন অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের ফেলে আসা জমি-বড়ি-ঘর রাষ্ট্রীয়ভাবে অধিগ্রহণ করবে। এমনকি রোহিঙ্গাদের মধ্যে যাদের ফেরত নেবে, তাদের ‘উন্মূক্ত কারাগারে’ রাখা হবে। তাই মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার যে প্রস্তাব দিয়েছে, তাকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও সতর্ক পর্যবেক্ষণে রেখেছে ঢাকা।

বর্বরোচিত নির্যাতন চলাকালে মিয়ানমারের ক্ষমতাধর নেত্রী সু চি তার ভাষণে বলেছেন, রাখাইনে সেনাবাহিনী কোনো নির্যাতন চালাচ্ছে না। গণমাধ্যম উল্টাপাল্টা লিখছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকেও মিয়ানমার মিথ্যাচার করেছে। এখন পর্যন্ত মিথ্যাচার করেই যাচ্ছে। আবার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব করেছে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার যদি সদিচ্ছাই থাকে তাহলে জাতিসংঘের মাধ্যমে নিলে অসুবিধা কোথায়? যেখানে জাতিসংঘের মহাসচিব রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনে ব্যথিত, ফিরিয়ে নেয়ার জন্য আহবান জানিয়েছেন।

নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক মেজর জেনারেল আব্দুর রশিদ (অব.) গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মিয়ানমারের মন্ত্রী ( টিন্ট সোয়ে) রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। এটাকে সরলভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তারা আন্তর্জাতিক চাপের মুখে একটি কৌশল নিয়েছে।

২৫ অগস্ট থেকে নির্যাতনের মুখে এ পর্যন্ত পাঁচ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন। মিয়ানমারের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল নিউ লাইটকে উদ্ধৃত করে ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে, বাংলাদেশে ঢোকার জন্য রাখাইনের পশ্চিমাঞ্চলের দুই গ্রামের মধ্যবর্তী সীমান্তের কাছে ১০ হাজারেও বেশি মানুষ জড়ো হয়েছেন। তারা মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

তবে মিয়ানমারের ডি-ফ্যাক্টো সরকারের মুখপাত্র গ্লোবাল নিউ লাইট তাদের প্রতিবেদনে দাবি করেছে, কর্তৃপক্ষ পালিয়ে যেতে চাওয়া রোহিঙ্গাদের বারবার আশ্বস্ত করতে চাচ্ছে যে, রাখাইনে তারা এখন নিরাপদ। তা সত্ত্বেও রোহিঙ্গারা নিজেদের ইচ্ছায় বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু ওয়াশিংটন পোস্ট তাদের নিজস্ব অনুসন্ধানের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, গ্রামবাসী ক্ষুধার যন্ত্রণায় ভুগছে। বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা ক্রমাগত তাদের হত্যার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।

নিজেদের গ্রাম থেকে রাখাইন বৌদ্ধঅধ্যুষিত গ্রামগুলো পার হতেও ভয় পাচ্ছে রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গা অ্যাডভোকেসি গ্রুপ আরাকান প্রজেক্টের প্রতিনিধি ক্রিস হ্যারিস এএফপিকে বলেছেন, গ্রাম-প্রধান যদি গ্রাম ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন, সঙ্গে সঙ্গেই সেই সিদ্ধান্ত মেনে গ্রাম শূন্য করে পালিয়ে যাবে।

দেশি এবং বিদেশি সংবাদমাধ্যম যে খবর দিচ্ছে, তাতে রাখাইনে নির্যাতন ও সহিংসতা বন্ধ হয়নি। সেটা অব্যাহত আছে। সোমবার বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে মন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠকের সময়ও সেখানে সহিংসতা হয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়। তাই মিয়ানমার যে মুখের প্রস্তাব দিয়েছে, মনের প্রস্তাব নয় তা সহজেই বোঝা যায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখা গেলে শেষ পর্যন্ত মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাধ্য হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।